প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প বা গার্মেন্টস খাত। পোশাকশিল্পের সঙ্গে লাখো লাখো শ্রমিকের জীবন-জীবিকা, বেঁচে থাকার অবলম্বন, হাজারো শিল্প উদ্যোক্তার স্বপ্ন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে। একটি শিল্প কারখানা শুধু ইট-পাথরের ভবনই নয়; এ শিল্প কারখানা অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন, কর্মসংস্থানের ঠিকানা এবং জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গার্মেন্টস শিল্পে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সবার জন্য উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি গার্মেন্টস শিল্পকে ঘিরে সংঘাত, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, কর্মবিরতি ও নানা ধরনের অস্থিরতা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সচল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমে উৎপাদন, আর উদ্যোক্তার বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় শিল্পের বিকাশ। সুতরাং মালিক ও শ্রমিক একে অপরের প্রতিপক্ষ নন; তারা একই শিল্পের পরিপূরক। একটি গার্মেণ্টস বন্ধ হলে শুধুমাত্র মালিকের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয় না; বিষয়টি এমন নয়, অসংখ্য শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে। তাদের পরিবারে নেমে আসে দু:খ, দুর্দশা ও হতাশার কালো ছায়া। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা হুমকির মুখে পড়ে। দেশে বেকারত্বের হার বাড়ে, দারিদ্র?্য বিস্তার লাভ করে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। চুরি ডাকাতি ছিনতাই ইত্যাদি বাড়তে থাকে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় কমে আসে, বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা-বিশ্বাস নষ্ট হয়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
বাহিরের দেশের বিনিয়োগকারীরা আসতে চায় না। দেশীয় উদ্যোক্তরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। সংঘাত সহিসতার প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা প্রতিশোধ কোনো সমস্যার সমাধান মাধ্যমে হতে পারে না। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
কোনো প্রকার উছকানিতে কান দেয়া যাবে না। একই সঙ্গে মালিকপক্ষকে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা, সময়মতো বেতন-ভাতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে পারস্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা ও সংলাপের ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা এমন একটি শিল্পব্যবস্থা চাই, যেখানে শ্রমিক তার শ্রমের যথাযথ মর্যাদা পাবেন, মালিক তার বিনিয়োগের নিরাপত্তা পাবেন, আর দেশ পাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতি।
মালিকের অগ্রগতি ছাড়া শিল্পের বিকাশ কঠিন, আবার শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা ছাড়া শিল্পের স্থায়িত্ব অসম্ভব। তাই বিরোধ নয়, সহযোগিতা; প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতা; সহিংসতা নয়, মানবিকতা হোক আমাদের অঙ্গীকার। বিভেদ ও সংঘাতের পথ পরিহার করে মালিক-শ্রমিক পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনে আবদ্ধ হোক। মালিক-শ্রমিকের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সমৃদ্ধ শিল্পভবিষ্যৎ গড়ে উঠুক। সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হোক এক মানবিক প্রত্যয়—মালিক বাঁচুক, শ্রমিকৎ বাঁচুক, কলকারখানা ও গার্মেন্টস শিল্প বাঁচুক, বাঁচুক দেশের অর্থনীতি। সহিংসতা নয়, ভালোবাসা ও সম্প্রীতিতে জাগুক মালিক-শ্রমিকের হৃদয়। ভালো থাকুক বাংলাদেশ।
লেখক : সূফিব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠাতা— বাব-ই-ইয়াছিন
'গুলশানে ইয়াছিন মনজিল', এলাহাবাদ, দেবিদ্ধার, কুমিল্লা