
দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ছায়ানট শুধু একটি সংগীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়- এটি এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, চর্চা ও চেতনার আন্দোলন। সংগীত শিক্ষা থেকে শুরু করে জাতীয় উৎসব, শিশুদের সাংস্কৃতিক বিকাশ থেকে গবেষণা- বহুমাত্রিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ছায়ানট হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট জন্ম নিয়েছিল এক দমবন্ধ সময়ের মধ্যে। পাকিস্তান আমলে যখন বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রান্তিক করে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল, তখন সানজীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সংগীতচর্চাকে প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও লোকগানের চর্চার মাধ্যমে ছায়ানট গড়ে তোলে এক অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ধারা, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিতকেও শক্তিশালী করে।
ছায়ানটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার শিক্ষা কার্যক্রম। ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে শুধু গান শেখানো হয় না; শেখানো হয় সংগীতের ব্যাকরণ, দর্শন, তাল-লয়, উচ্চারণ- সব কিছুর সমন্বয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী গড়ে তোলা হয়।
শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীত- প্রতিটি ধারায় নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ছায়ানট তৈরি করছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিল্পী, যারা সংগীতকে শুধু পেশা নয়, চর্চা ও সাধনা হিসেবে গ্রহণ করে।
শিকড় : ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক বীজতলা : শিশুদের জন্য ছায়ানটের ‘শিকড়’ কার্যক্রম এক দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ। এখানে গান, ছড়া, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে গড়ে তোলা হয় সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ। এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য শুধু শিল্পী তৈরি নয়- বরং এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা নিজেদের ঐতিহ্যকে জানবে, বুঝবে এবং ধারণ করবে।
ছায়ানটের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয় একটি ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চা সমান গুরুত্ব পায়। বর্তমানে এখানে প্রায় সাড়ে নয়শত শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ছায়ানট ভবনে প্রাথমিক শাখা এবং কেরানীগঞ্জের অপালা ভবনে পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস- এই দুই কেন্দ্র মিলিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এর কার্যক্রম।
নালন্দার লক্ষ্য একটাই- শিশুকে আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখানো, তাকে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক এবং মানবিক করে গড়ে তোলা।
নালন্দার অধ্যক্ষ সুমান বিশ্বাস বলেন, ‘শেখা কখনও চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, এটি আনন্দের মধ্য দিয়ে ঘটতে হবে। শিশুরা যেন প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারে- আমরা সেই পরিবেশই তৈরি করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু নিজের সংস্কৃতি নয়, তারা যেন সব ভাষা ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়- সেটাই আমাদের শিক্ষা।’
উৎসব ও আয়োজন : জাতীয় পরিচয়ের অংশ : ছায়ানটের সবচেয়ে পরিচিত আয়োজন পহেলা বৈশাখের প্রভাতী অনুষ্ঠান। রমনা বটমূলে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সংগীত পরিবেশনের এই ঐতিহ্য এখন বাংলাদেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এছাড়া তারা নিয়মিত আয়োজন করে ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, সেমিনার, কর্মশালা এবং সাংস্কৃতিক আলোচনা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ছায়ানটও নিজেকে বদলেছে। এখন তারা ডিজিটাল মাধ্যমেও সক্রিয়। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল কনসার্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশের মাধ্যমে তারা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ‘জাগরণী’ নামে তাদের ডিজিটাল উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিদিন সংগীতভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। ছয় দশকের সংগীত ভান্ডার থেকে এসব কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।