
ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কলেজ শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম (২৫) হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণ করেছেন আদালত। এতে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ পলাতক ১৭০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ফেনী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হাসান এ আদেশ দেন।
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এক দফা দাবির অসহযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন কলেজ ছাত্র মাহবুবুল হাসান মাসুম। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এ ঘটনায় ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নিহতের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে ১৬২ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ৪০০-৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। গত বছরের ৩১ জুলাই নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মামলায় চার্জশিট দেওয়ার কথা জানান তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বলেন, এ মামলায় এজাহারনামীয় ১২ জন ও সন্দেহভাজন ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মুরাদ হাসান বাবুসহ তিন আসামি ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলায় ১৫৬ জন এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত ৬৫ জনসহ মোট ২২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, মাসুম হত্যা মামলায় পলাতক ১৭০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। আসামিদের মধ্যে ৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের বিচার শিশু আদালতে করা হবে। ফেনী জেলা ও দায়য়া জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন মামুন বলেন, আগামী ২২ জানুয়ারি এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে। সাড়ে ৫ মাস পর বুধবার আদালত চার্জশিট গ্রহণ করেছে। এর আগে চার্জশিট গ্রহণ ও পর্যালোচনার জন্য গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ও ১৩ নভেম্বর দিন ধার্য থাকলেও গ্রহণ করা হয়নি। সর্বশেষ আজ চার্জশিট গ্রহণ ও শুনানি হয়। এ মামলায় উল্লেখযোগ্য অন্য পলাতক আসামিরা হলেন- সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন, পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার সাবেক মেয়র নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাজেল, সোনাগাজী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম পিটু, জিয়া উদ্দিন বাবলু প্রমুখ। নিহত মাসুম সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের তরাব পাটোয়ারী বাড়ির মৃত মাওলানা নোমান হাসানের ছেলে। তিনি ছাগলনাইয়া আব্দুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক সম্পন্ন করেন।
মামলার বাদী ও নিহতের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাই। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিপালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের করা গুলি মাসুমের মাথায় লাগে। সহপাঠীরা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তিন দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আমার ভাই না ফেরার দেশে চলে যায়। জানা যায়, গত ৪ আগস্ট মহিপালে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় এখন পর্যন্ত ২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি হত্যা এবং ১৭টি হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে।