
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে একটি ‘বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী রূপরেখা’ নির্মাণকে লক্ষ্য ধরে ৩৬ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
দলের রাষ্ট্রকল্প, নীতিগত অবস্থান এবং সংস্কারভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতায়ই এই ইশতেহার প্রণয়ন করার কথা তুলে ধরে এনসিপি বলেছে, জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সমস্যা, এই সবকিছুকে ভিত্তি করে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।
গতকাল শুক্রবার বিকালে ঢাকার একটি হোটেলে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দলটি তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে।
এনসিপির নির্বাচনি ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়েছে, এটি কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধারণাপত্র নয়।
‘জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সমস্যা সবকিছু ভিত্তি করে একটি বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী রূপরেখা নির্মাণই এই ইশতেহারের উদ্দেশ্য।’
দলটির দাবি, ‘ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার ন্যায্যতা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এনসিপি নির্বাচনে জেতার জন্য জনগণকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ধোঁকা দিতে চায় না।
‘বর্তমান অর্থনৈতিক ও সমাজ বাস্তবতায় আমাদের স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়তে আগামী পাঁচ বছরে যতটুকু পরিবর্তন আনা সম্ভব, ততটাই এই ইশতেহারে এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এনসিপি সরকারের অংশ হলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে এই ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তরুণদের দলটি।
অর্থনীতি, নারী, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ক চারটি উপস্থাপনার পর ৮৬ পৃষ্ঠার ইশতেহার তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এ সময় এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ বলেছেন, ‘এখানে হয়তো সব বিষয়, সব সেক্টর হয়তো কাভার হয় নাই। কিন্তু এটা আমাদের হচ্ছে অগ্রাধিকার তালিকা। যেটা সরকারের অংশীদার হলে আমরা এটাকে বাস্তবায়ন করব।
‘এ কথা এ কারণে বলতেছি কারণ আমরা গভর্মেন্টের অংশীদার হব।’
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আমরা একটা জোট প্রক্রিয়ায় আছি। এই জোটে ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের দল থাকলেও এই জোট সরকার গঠন করলে কোনো নির্দিষ্ট দলের আদর্শ সরকারের নীতি বা সরকারকে ডমিনেট করবে না বা গাইড করবে না বরং আমরা একটা সমন্বিত জায়গায় এসে কাজ করব। আমাদের যে নূন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচি সংস্কার, বিচার এবং দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদ বিরোধিতা, সেই জায়গাতে আমরা হয়তো ঐক্যের জায়গায় থাকব।’
‘নতুন বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্ট’ নতুন রাজনৈতিক দলটির জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছে তা স্বীকার করে নিয়ে নাহিদ ইসলাম এটি তাদের নির্বাচনি জোট।
তিনি বলেন, ‘আমাদের চেষ্টা থাকবে এই জোটের মধ্য দিয়ে আমাদের যে সংস্কারের যে দাবি আমরা সেটাকে বাস্তবায়ন করব এবং আমাদের অগ্রাধিকারটাই আমরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। ফলে এ কারণে আমরা কিন্তু আমাদের ইশতেহারটা আলাদা আমরা দিচ্ছি এনসিপির পক্ষ থেকে। জামায়াতে ইসলাম তাদের একটা ইশতেহার দিয়েছে।’
তার আগে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘এই ইশতেহার জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের ফল, জুলাই পদযাত্রা থেকে শুরু করে আমরা দেশের পথে প্রান্তরে গিয়েছি, আমরা মানুষের কথা শুনেছি। মানুষ আমাদের তাদের বক্তব্যগুলো দিয়েছে, তাদের দাবিগুলো জানিয়েছেন।
‘আমরা সমাজের বিভিন্ন কমিউনিটির সঙ্গ বসেছি, তাদের কথা শুনেছি, বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর সাথে বসেছি, শ্রমিকদের নেতৃত্বে সাথে বসেছি, সকলের কথার ভিত্তিতে এই ইশতেহার তৈরি হয়েছে।’
১২ অধ্যায়ে বিভ্ক্ত ৩৬ দফা অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত হয়েছে বলে জানান আসিফ মাহমুদ।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
তার তিন দিন পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই আন্দোলনের সময়ের হত্যা ও গুমণ্ডনির্যাতনের বিচার ও নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দেয়।
আর রাজনীতিতে নয়া বন্দোবস্তের লক্ষ্য ধরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি।
দলটি জামায়াতের ইসলামীর সঙ্গে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য নামে মোর্চা গড়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন করছে।
ভোট সামনে রেখে এনসিপি যে ইশতেহার দিয়েছে সেটি ১৯টি ভাগে বিভক্ত।
দলটি বলছে, সেই ভাগগুলো থেকে জনগণের জীবন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ৩৬ দফা অগ্রাধিকার হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।
ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার ন্যায্যতা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলেও দাবি করেছে দলটি।
নির্বাচিত হলে অর্থনীতি খাতে এনসিপি কী করতে চায় সে বিষয়ে উপস্থাপনা তুলে ধরেন দলের যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মো. আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। এরপর নারী বিষয়ে উপস্থাপনা নিয়ে আসেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। দলের জ্যেষ্ঠ আহ্বায় ডা. গউসুল আযম স্বাস্থ্য বিষয়ে উপস্থাপনা তুলে ধরেন। ইশতেহার বিষয়ক উপকমিটির সেক্রেটারি ইশতিয়াক আকিব উপস্থাপনা করেন শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ে এনসিপির পরিকল্পনা।
দলটির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম দফায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এনসিপি মনে করে, মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ফ্যাসিবাদী কাঠামোর পুনরুত্থান রোধ করা সম্ভব নয় এবং গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ অর্থে গণতান্ত্রিক রূপান্তরে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
এই বিশ্বাস থেকে এনসিপি ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ নির্মাণের লক্ষ্যকে কেন্দ্রে করে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে বলে ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়েছে।
জুলাইয়ে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘গণহত্যা’ ছাড়াও ‘শাপলা গণহত্যা’, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে এনসিপির ইশতেহারে।
অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়াকে সে দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রথম ধাপ বলছে এনসিপি।
জুলাই অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এছাড়া প্লট দুর্নীতির ৫ মামলায় মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ফেরত চেয়ে চিঠি দিলেও ভারত সরকার সাড়া দেয়নি।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়।
এনসিপি বলছে, তারা ভারতে সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চায়। তবে তা হবে ‘সমতা, পারস্পরিক মর্যাদা ও ন্যায্যতা ভিত্তিতে’। ‘আমরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র-টু-রাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্কচাই। কোনো ধরনের আগ্রাসনবাদী আচরণ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা একতরফা সুবিধা আদায়ের নীতি গ্রহণযোগ্য নয়।’
প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ‘রিজার্ভ ফোর্স’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি।
এনসিপির ৩৬ দফা
১. জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের উপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ে সংঘটিত ‘গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ’ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করা হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার-সম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সকল জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫. আমলাতন্ত্রে ‘ল্যাটেরাল এন্ট্রি’ (প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে নিয়োগ) বৃদ্ধি করা হবে এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি হবে পার্ফরমেন্স-ভিত্তিক। পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তিন বছরে হালনাগাদ করা হবে এবং পে-স্কেলে ইমামণ্ডমুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
৬. বিভিন্ন কার্ডের ঝামেলা ও জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সকল সেবা প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা, বাধ্যতামূলক কর্মণ্ডসুরক্ষা বীমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮. টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ/ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০. গরীব ও মধ্যবিত্তের উপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২%-এ উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হবে ও ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
১১. পরিকল্পিতভাবে এলডিসি উত্তরণের জন্য আগাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি-সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (এফটিএ-সিইপিএ) করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাত (ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ও পুঁজিবাজারে) শৃঙ্খলা ফেরানো হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজ, কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার নিশ্চিত করা হবে।
১২. স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে, ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩. মুদ্রাস্ফীতি ৬%-এ নামানো হবে; ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে ‘ইয়ুথ সিভিক কাউন্সিল’ গঠন করা হবে।
১৫. আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এসএমই খাতে ক্যাশফ্লো-ভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
১৬. সরকার-নিয়ন্ত্রিত ‘প্লেসমেন্ট’, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে।
১৭. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সকল ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫% এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।
১৮. উচ্চশিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ। থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের জ্যেষ্ঠতা ও ল্যাবের জন্য এককালীন তহবিল দিয়ে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেইন’ করা হবে। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০. হৃদরোগ, ক্যান্সার, ট্রমা, বন্ধ্যাত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন (এসএইচজেড) গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরি করা হবে।
২১. দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি-হসপিটাল এমার্জেন্সি সিস্টেম গঠন করা হবে যেখানে এমার্জেন্সি প্যারামেডিক রেসপন্স টিম সংযুক্ত থাকবে। সকল বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অত্যাধুনিক এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হবে। প্রতি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত আইসিইউ ও সিসিইউ এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
২২. প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
২৩. নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবো যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে হ্রাস করা হবে।
২৪. সকল প্রতিষ্ঠানে পূর্ণবেতনে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক ‘পিরিয়ড লিভ’ চালু করা হবে এবং ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৫. উপজেলা-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোতে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি স্কুল ও কলেজে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে।
২৬. একটি ‘ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল’ (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু অনলাইনে করা যাবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং চালু করা হবে।
২৭. প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে রেমিটমাইলস’ নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদান করা হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে একক কর্তৃপক্ষের আওতায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা করা হবে এবং মালবাহী ট্রেন বাড়িয়ে সড়কপথে ট্রাকের চাপ কমানো হবে।
৩০. দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০% ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা হবে।
৩১. দেশের সকল শিল্পকারখানায় কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। শিল্পদূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩২. এনআইডি-ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউজ স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৩৪. ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সকল বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে।
৩৫. দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমাধান ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘রেগুলার ফোর্সের’ দ্বিগুন আকারের ‘রিজার্ভ ফোর্স’ তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি মনুষ্যবিহীন যান বা ইউএভি ব্রিগেড গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে।