ঢাকা শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

এবার ইরানের পাল্টা হামলার পরিধি হবে ‘সীমাহীন’

* ইরানে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন পড়বে না, ট্রাম্পের আশা * ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ * ইরানের পক্ষে থাকার আশ্বাস তুরস্কের * ইরানে হামলায় আজারবাইজানের ভূমি-আকাশ ব্যবহারের সুযোগ নেই
এবার ইরানের পাল্টা হামলার পরিধি হবে ‘সীমাহীন’

যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায় তাহলে পাল্টা হামলা আগেরবারের মতো আর সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে জানিয়েছেন ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া। গতকাল শুক্রবার তিনি এমন হুমকি দেন। রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রকাশিত বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা হামলা চালানো হবে। যা হবে চূড়ান্ত এবং দৃঢ়সংকল্পমূলক।

গত বছরের জুনে দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়। ১২ দিনের ওই যুদ্ধের শেষদিকে ইরানের চারটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় মার্কিন বিমানবাহিনী। এছাড়া এতে যুদ্ধবিমানবাহী রণতরীও ব্যবহার করা হয়েছিল। মার্কিনিদের এ হামলা ছিল সীমিত। এর জবাবে ইরানও সীমিত হামলা চালিয়েছিল। তারা কাতারে অবস্থিত মার্কিন বিমানবাহিনীর ঘাঁটি আল-উদেইদে মিসাইল ছুড়েছিল। পরে ট্রাম্প ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। তবে এবার আর এমন কিছু হবে না হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র। তিনি স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তাদের পাল্টা হামলা হবে দীর্ঘ।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালানোর মতো ভুল হিসাবনিকাশ করে, তাহলে ট্রাম্প যেভাবে ভাবছেন সেভাবে সবকিছু হবে না। তিনি আকস্মিক হামলা চালাবেন এরপর দুই ঘণ্টা পর টুইট করবেন অভিযান শেষে হয়েছে, এমনটি হবে না।’ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও রণতরীগুলো তাদের মিসাইলের কাছে দুর্বল বলেও দাবি করেছেন এ সেনা কর্মকর্তা। এছাড়া ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিনিদের সব সামরিক অবকাঠামো ইরানের মধ্যম পাল্লার মিসাইলের পরিধির মধ্যে আছে। ইরানে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন পড়বে না- ট্রাম্পের আশা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে চান। সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনা করার পরিকল্পনাও তার রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনীতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার প্রথম মেয়াদে আমি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছি, আর এখন আমাদের একটি বাহিনী ইরান নামের একটি স্থানের দিকে এগোচ্ছে। আশা করি আমাদের সেটি ব্যবহার করতে হবে না।’

ইরানের সঙ্গে তিনি আলোচনা করবেন কি না- এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আগেও আলোচনা করেছি, আবার করার পরিকল্পনাও রয়েছে। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বড় ও অত্যন্ত শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে যাত্রা করছে। তবে সেগুলো যদি ব্যবহার করতে না হয়, সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো।’

ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, কয়েক দিন ধরেই এমন জল্পনা-কল্পনা চলছে। এরই মধ্যে গত সোমবার মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান অভিমুখে আরও নৌবহর পাঠানোর কথা জানিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে সামরিক মহড়া চালানোরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আরও একটি সুসজ্জিত নৌবহর ইরানের পথে আছে। আমি আশা করছি, তারা (ইরান) সমঝোতা করতে রাজি হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র : মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করায় মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে অতিরিক্ত একটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে বলে বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।

নাম না প্রকাশের শর্তে কথা বলা ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক’ নামের যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এর ফলে বর্তমানে অঞ্চলটিতে ছয়টি ডেস্ট্রয়ার, একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও আরও তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ অবস্থান করছে। অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবরটি প্রথম প্রকাশ করে সিবিএস নিউজ।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অবস্থান বাড়ানোকে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা ও অঞ্চলজুড়ে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চারপাশে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ গড়ে তুলেছে। অতিরিক্ত নৌবহর, যুদ্ধবিমান ও সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের আশপাশে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সামরিক উপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবেই এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে এবং তেহরান থেকে এ নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও এসেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এ সময় তাদের আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও দু’দেশের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন।

ফোনালাপে দু’দেশের নেতারা পরস্পরের মতামত বিনিময় করে এবং জোর দিয়ে বলেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আলোচনাসহ কূটনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য। কথোপকথনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান ও ইরানের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বন্ধনে ভর করে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য নিয়মিত উচ্চস্তরের যোগাযোগ ও পরামর্শ চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব আছে।

ইরানের পক্ষে থাকার আশ্বাস তুরস্কের : ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনও ধরনের সামরিক হামলার তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে দেশটির পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে তুরস্ক। এছাড়া ইরানের অভ্যন্তরীণ যে কোনও সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান ইরানের জনগণের হাতেই থাকা উচিত। শুক্রবার দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর এসব মন্তব্য করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। গতকাল ইস্তাম্বুলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফিদান বলেন, ‘আমরা প্রতিটি সুযোগে আমাদের অংশীদারদের জানিয়েছি যে ইরানকে লক্ষ্য করে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে আমরা অবস্থান নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই ইরানি জনগণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে।’ সম্প্রতি ইরানের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ দমন নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ‘বিশাল নৌবহর’ ইরানের কাছে অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে হামলা থেকে রেহাই পেতে তেহরানকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালালে এর জবাব হবে ‘দ্রুত ও সর্বাত্মক’। তবে তারা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও চাপমুক্ত শর্তে আলোচনার পথ এখনও খোলা রয়েছে।

ইরানে হামলায় আজারবাইজানের ভূমি-আকাশ ব্যবহারের সুযোগ নেই : ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো হামলার ক্ষেত্রে আজারবাইজানের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বাইরামভ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে আজারবাইজান কখনোই তার আকাশসীমা বা ভূখণ্ড কোনো রাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেবে না। গত বৃহস্পতিবার আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বাইরামভ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছেন। আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।

ফোনালাপে জেইহুন বাইরামভ বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলে যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তিনি উল্লেখ করেন, ইরান ও এর আশপাশের অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ বা বক্তব্য থেকে সব পক্ষকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছে আজারবাইজান। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের নীতি ও বিধানের আলোকে শুধু সংলাপ ও কূটনৈতিক উপায়েই সব সমস্যা সমাধান করা উচিত।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত