
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাঁক পরিবর্তনের নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। গতকাল রোববার দুপুরে জামালপুর সিংহজানী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, ‘এবারের নির্বাচন বাঁক পরিবর্তনের নির্বাচন। এই নির্বাচন ১ হাজার ৪০০ শহীদের ওপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন। এই নির্বাচন আয়না ঘরের অন্ধকার যুগের অবসানের নির্বাচন। শহীদ পরিবারগুলোর হাহাকার অবসানের নির্বাচন। অতীতের বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনার নির্বাচন।’
ক্ষমতায় গেলে যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুবকরা ভাতা চায় না, কাজ চায়। বেকার ভাতা দিয়ে যুবকদের অপমানিত করবো না, তাদের হাতে কাজ তুলে দেবো। যে যুবকদের হাতে কাজের নিশ্চয়তা দেবো, তাদের হাতেই বাংলাদেশ তুলে দেবো।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ পরাজিত হলে বাংলাদেশ পরাজিত হবে। হ্যাঁ-তে আজাদি, না-তে গোলামি। যারা জাতিকে গোলামির জিঞ্জির পরাতে চায়, তারা না চায়। কিছু দল হ্যাঁ ভোটের পক্ষে স্বস্তির সাথে কিছু বলতে চান না। আস্তে আস্তে লুকিয়ে বলেন। আপনারা না চাইলে প্রকাশ্যে বলে দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহীদরা আমাদের কাঁধে রেখে গেছেন লাশ আর হাতে রেখে গেছেন রক্ত। আমরা লাশ আর রক্তের সাথে বেইমানি করতে পারবো না। জামায়াত নিজেদের ক্ষমতা চায় না, জনগণের ক্ষমতা চায়। ১৮ কোটি জনগণের বিজয় হলেই জামায়াতের বিজয়। ক্ষমতা দায়িত্বের বোঝা। জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে প্রতি বছর জনগণের সামনে তাদের সম্পদের হিসাব তুলে ধরতে বাধ্য থাকবে। কথা দিচ্ছি—আপনাদের টাকা আপনাদের কাজে লাগবে। আপনাদের দাবি আপনাদের চোখের সামনে বাস্তবায়ন হবে।’
চব্বিশের শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘যে মায়েরা এমন সাহসী শহীদদের জন্ম দিতে পারে, সেসব মায়েদের এই বাংলাদেশ, পথ হারাবে না।’
নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গৃহ, কর্ম এবং চলাচলে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা হবে। নারীদের হাতে কাজ তুলে দেওয়া হবে। সব কাজের অংশীদার হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। যার যে হক আছে, তা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
সংখ্যালঘুদের নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ফুলের বাগান। সব জাতের ফুল দিয়ে বাংলাদেশ নামক বাগান সাজাবো। ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা হবে না। শুধু দেখা হবে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি নিবেদন।’
এ সময় জামালপুর জেলার নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয় আল্লাহর পরীক্ষা, কিন্তু এটা অবহেলা করা জঘন্য অপরাধ। এর মূল কাজ সরকারের। বিগত স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে ঘুরেছেন। পানিতে দূরের কথা, মাটিতেই পা পড়েনি। জনগণের প্রতি যাদের দায়বদ্ধতা নাই, তারা কেন এগিয়ে আসবে? প্রতিটি বিপদে আমাদের উপস্থিতি ছিল।’
মানুষ খুনের রাজনীতি আমরা ঘৃণা করি : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাজনীতির নাম যদি মানুষ খুন হয়, সেই রাজনীতি আমরা ঘৃণা করি। একটি দল চব্বিশ পরবর্তী সময়ে মাত্র সতেরো মাসেই নিজেদের দুই শতাধিক লোককে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এমন রাজনীতি আমরা চাই না। গতকাল রোববার শেরপুর শহরের শহীদ দারোগা আলী পৌরপার্ক মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা চায়, যেখানে তুচ্ছ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে হানাহানি হবে না, নোংরা রাজনীতি হবে না এবং মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হবে না। আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে স্পষ্ট দিবালোকে একজন বিশিষ্ট শিক্ষক অধ্যাপক ও শ্রীবরদী উপজেলার সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অবশ্যই যারা হত্যা করেছেন তাদের জন্য এটি উওর না। তারা তো নিজের দলের ২ শতাধিক মানুষকে বিদায় করে দিয়েছে। যে রাজনীতি মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে খুন করে এটা আবার কোন রাজনীতি। আল্লাহ তায়ালা ৫ তারিখ দেশে একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আল্লাহর কসম, বাংলাদেশে আসমানের ছাদের নিচে সবচেয়ে নির্যাতিত দলটি হচ্ছে বাংলাদেশ জামাত ইসলামী। একের পর এক সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় ১১ জন শীর্ষ নেতাকে ঠান্ডা মাতায় হত্যা করা হয়েছে। আমরা এখন আর এগুলো চাই না।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়। ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজের দলের লোকদেরই হত্যা করা হচ্ছে এটা কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না।
জনসভায় জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ড. ছামিউল ফারুকী, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক রিয়াদ হোসাইন, ডাকসুর সাবেক জিএস এস এম ফরহাদসহ জামায়াত ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
রেজাউলের সন্তানকে কোলে নিয়ে কবর জিয়ারত করলেন জামায়াত আমির : শেরপুরে শ্রীবরদীতে সংঘর্ষে নিহত রেজাউল করিমের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে তার কবর জিয়ারত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের গোপালখিলা গ্রামে রেজাউল করিমের বাড়িতে যান জামায়াত আমির।
এ সময় তিনি নিহত রেজাউল করিমের বৃদ্ধ বাবা ও শ্বশুরকে জড়িয়ে ধরে স্বান্তনা দেন এবং রেজাউলের তিন বছর বয়সী ছেলেসন্তানকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরে শিশুটিকে কোলে নিয়েই তার বাবা রেজাউল করিমের কবর জিয়ারত ও দোয়া পরিচালনা করেন শফিকুর রহমান।
গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে-৩ আসনের ঝিনাইগাতী মিনি স্টেডিয়ামে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘ইশতেহার পাঠ’ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম।
তার কবর জিয়ারতের সময় জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সামিউল হক ফারুকী, শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
জিয়ারত শেষে স্থানীয়দের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করেন জামায়াত আমির। এ সময় রেজাউল হত্যার চারদিন পেরিয়ে গেলেও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এর আগে হেলিকপ্টারে এসে রোববার সকাল ১১টায় গোপালখিলা খেলার মাঠে অবতরণ করেন জামায়াত আমির। কবর জিয়ারত শেষে তিনি ফের হেলিকপ্টারে শেরপুর শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্ক মাঠে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দেন।
আজ কক্সবাজার আসছেন জামায়াতের আমির : নির্বাচনী প্রচারণায় আজ সোমবার ২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার আসছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এ দিন তিনি প্রথমে মহেশখালীতে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। এরপর কক্সবাজার শহরের মুক্তিযোদ্ধা মাঠে আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন। তার সফর উপলক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। গতকাল রোববার সকালে মুক্তিযোদ্ধা মাঠে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জনসভাস্থল পরিদর্শন করেন দলটির কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল।
জনসভা লাখো মানুষের অংশগ্রহণে জনসমুদ্রে পরিণত হবে জানিয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মো. শাহজাহান বলেন, মানুষ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে আছেন। আজ জনসভায় সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি তাক লাগিয়ে দেবে।
তিনি জানান, মহেশখালী ও কক্সবাজার শহরের জনসভা শেষ করার পর চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলার পদুয়ায় জনসভায় যোগ দেবেন জামায়াতের আমির।