ঢাকা বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে ইরানের

মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে ইরানের

মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা বিষয়ক মূল্যায়ন নথির বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরান এখনো কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থে আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। এসব সামরিক স্বার্থের মধ্যে রয়েছে ১০টিরও বেশি ঘাঁটি ও কয়েক দশ হাজার মার্কিন সেনা।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্রের প্রস্তুতকৃত মূল্যায়ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান গোলাবারুদ, উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বজায় রেখেছে। এসব সক্ষমতা এই অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই সক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প এর আগে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথা বললেও এখন এই অবস্থান পরিবর্তন করে তেহরানকে পারমাণু বিষয়ক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, যা ২০১৫ সালে ইরানের পরমাণু চুক্তি জেসিপিওএ থেকে সরে যাওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এক ইরানি কূটনীতিক বলেছেন, তেহরান সম্মানজনকভাবে সম্পৃক্ত হতে প্রস্তুত, কিন্তু চাপ ও সামরিক হুমকির মধ্যে আলোচনায় বসবে না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ১২ দিনের হামলায় দখলদার ইসরায়েলের পাশে ছিল, যার জবাবে ইরান কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের দেখিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে এবং নতুন কোনো সংঘাত হলে এসব হামলা সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত থাকবে না

এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশ ঘোষণা করেছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।

যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, প্রস্তুত ইরান : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুদ্ধ নিয়ে তেহরান কোনোভাবেই উদ্বিগ্ন নয়, কারণ তারা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সংঘাত শুরু হয়, তবে তা ইরানের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গতকাল রোববার তেহরানে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাগচি।

একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।

তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আর আমরা নির্ভরযোগ্য আলোচনাসঙ্গী হিসেবে বিশ্বাস করি না।’

তবে তিনি যোগ করেন, আঞ্চলিক বন্ধুসুলভ দেশগুলোর মাধ্যমে বার্তা আদান–প্রদানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং তা ফলপ্রসূ হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আরাগচি বলেন, আলোচনার ধরন নয়, বরং আলোচনার মূল বিষয়বস্তুর দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা।

আরাগচি বলেন, ‘অসম্ভব বিষয় নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়। পারমাণবিক অস্ত্র যেন না থাকে—এমন একটি ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। আমি আগেই বলেছি, এটি অল্প সময়ের মধ্যেই সম্ভব।’

এর বিনিময়ে ইরান আশা করবে, দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে এবং শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার ইরানের অধিকারকে সম্মান জানানো হবে।

আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এমন আশ্বাসও দেন আরাগচি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন যুদ্ধ ‘সবার জন্যই ভয়াবহ বিপর্যয়’ ডেকে আনবে এবং সে ক্ষেত্রে পুরো অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

ইইউ রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে ইরান : ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে ইরান। গতকাল সোমবার দেশটি জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করার পর তারা তেহরানে নিযুক্ত ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।

তেহরানে দূতাবাসে রয়েছেন এমন সব ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, অন্যান্য পদক্ষেপ ঘোষণার আগে এটি সবচেয়ে ছোট পদক্ষেপ।

এর আগে ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনাবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে ঘোষণা করে ইরান। রবিবার ইরানি সংসদের স্পিকার এই তথ্য জানান।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করার পর তেহরান পাল্টা সিদ্ধান্ত নেয়।

স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ জানান, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার পাল্টা আইনে নির্ধারিত ব্যবস্থার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সংহতির প্রকাশ হিসেবে তিনি বিপ্লবী গার্ডদের ইউনিফর্ম পরে সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেন।

গত বৃহস্পতিবার ইরানের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের জবাবে আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

ইউরোপের এই সিদ্ধান্তকে ‘বড় কৌশলগত ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে লেখেন, এই মুহূর্তে বহু দেশ সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, অথচ ইউরোপ আগুনে ঘি ঢালছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত আইআরজিসি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি আনুগত্যশীল একটি অভিজাত প্যারামিলিটারি বাহিনী। পৃথক নৌ ও বিমান বাহিনীসহ এর স্থলবাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার।

যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে, কানাডা ২০২৪ সালে ও অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

ইইউয়ের এই সিদ্ধান্তে এখন চাপ বাড়ছে যুক্তরাজ্যের ওপর, যারা এখনও আইআরজিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করেনি। তবে ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছে দেশটি।

ইরানের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে এখনও আশাবাদী ট্রাম্প : চরম কূটনৈতিক বৈরিতা ও উত্তেজনা সত্ত্বেও এখনও ইরানের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত রোববার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে এ আশাবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে গত বেশ কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তিক্ততা চলছে। গত বছর জুন মাসে এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়েছিল ইরান।

১২ দিনের সেই সংঘাত শেষে যদিও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চলছে দু’দেশের মধ্যে, কিন্তু তিক্ততা একটুও কমেনি। সম্প্রতি ইরানে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহিংসতা চালায়, তাহলে দেশটিতে মার্কিন বাহিনী সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।

পরে অবশ্য আর অভিযান চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র, তবে অতি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন-সহ বিশাল এক নৌবহর মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা হামলার আশঙ্কাকে উসকে দিচ্ছে।

গত রোববার ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, “ইরানের জনগণ ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর নিয়ে ভীত নয়; বরং মার্কিনিদের এটা জানা থাকা উচিত যে যদি তারা যুদ্ধ শুরু করে— তাহলে এবার তা শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ থাকবে না— পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।”

খামেনি এই মন্তব্য করার কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই, তিনি এমন মন্তব্য করতেই পারেন। আশা করি আমরা (ইরানের সঙ্গে) একটা সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব। যদি তা না পারি, সেক্ষেত্রে তিনি (খামেনি) সঠিক কি না তা যাচাই করব বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত