
রোজা রেখে উপোস থাকতে হয় ভোর থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত। স্বামী-স্ত্রীর যৌন সংসর্গও নিষেধ দিনের বেলা। কেন এই বিধান? এই উপোস থাকাতে রোজাদারের কী লাভ এবং মহান আল্লাহ তাআলাও কেন এমন বিধান দিলেন। বান্দাকে উপোস রেখে দীর্ঘ একমাসব্যাপী দিনের বেলা পেটের ক্ষুধা-যৌন ক্ষুধা থেকে বিরত রাখার পেছনে আল্লাহর ইচ্ছা কী। কেনো বান্দা এতো কষ্ট করবে। এমন তো নয় যে, আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থাপনায় খাদ্য বা পানীয়ের অভাব পড়ে; তাই বছরে একটি মাস খাদ্য পানীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিংবা রোজাদার বান্দারা দিনের বেলা না খাওয়ার ফলে বেঁচে যাওয়া খাদ্যশস্য পানীয় কী আল্লাহর ভাণ্ডারে গিয়ে জমা হয়?
বিষয়টি আল্লাহ পাক নিজেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে। বলেছেন, “হে ঐসব লোক যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকাওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)
প্রথম কথা, রোজার বিধান দিয়ে কেবল উম্মতে মুহাম্মদীকে কষ্টের মধ্যে ফেলা হয়নি; বরং আগেকার জাতিসমূহের উপরও রোজা ফরজ ছিল। রোজা রাখা কষ্টকর হলে তা কেবল এ জমানার মুসলমানদের হচ্ছে না; বরং আগেকার যুগের জাতিসমূহকেও এই কষ্ট করতে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত এই সাধনায় লাভ স্বয়ং বান্দার। বান্দার উপকারের জন্যই আল্লাহ পাক এই বিধান দিয়েছেন। আমরা নগদ মুনাফাকে লাভ বলে থাকি; রমজানের সিয়াম সাধনায় প্রাপ্ত মুনাফা বৈষয়িক বা আর্থিক লাভ বা প্রাপ্তির মতো কোনো বিষয় নয়; বরং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মতো একটি বিষয়। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা পড়ে। তাদের পড়ানোর পেছনে হাজার হাজার, লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। পরে ফাইনাল পরীক্ষায় সন্তানের সাফল্য দেখে অভিবাকরা জীবনের কষ্ট ভুলে যায়। পরীক্ষার্থী নিজে আহ্লাদিত হয়। পরীক্ষা পাশের এই লাভকে বৈষয়িক কোনো লাভ-মুনাফার সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমরা একেকটি ডিগ্রি লাভ করি, সে ডিগ্রির বরাতে সরকারী, আধা-সরকারী ক্ষেত্রগুলোতে চাকরী হয়, প্রতিষ্ঠা লাভ হয়, আজীবন সুখী থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। রমজানের সাধনার পর যে মুনাফা বা ডিগ্রি পাওয়া যায় তার নাম তাকওয়া।
পৃথিবীর সবচে‘ নির্ভুল গ্রন্থ পবিত্র কুরআন। এই গ্রন্থ সরাসরি আল্লাহর বাণী। আল্লাহর কথা জিবরাঈল নামক একজন মহাসম্মানিত ফেরেশতা আসমান থেকে নিয়ে আসেন জমিনে, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আনিত এসব বাণী নবীজি (সা) সংকলিত করেন একটি গ্রন্থে। সেই গ্রন্থের নাম কুরআন। কুরআনের শুরুতে বলা হয়েছে “এটি মহান এক কিতাব; এই কিতাবে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ নেই। এই কিতাব মুত্তাকীদের হেদায়েতের জন্যে।”
হেদায়ত মানে পথ দেখানো । জীবন চলার সঠিক, সুন্দর পথ কী, তা বাৎলে দেয় কুরআন। কুরআনের পরতে পরতে তা লেখা আছে। কুরআন পড়লে সেই পথের সন্ধান পাওয়া যায়, পরিচয় মেলে। তবে এই হেদায়ত সবার জন্য নয়। মুত্তাকী লোকেরাই এই হেদায়ত লাভ করবে। মুত্তাকী মানে যাদের মধ্যে তাকওয়া আছে, যারা কথায়, কাজে, আচরণে তাকওয়ার চর্চা করে।
তাকওয়া মানে কী। তাকওয়ার ভালো বাংলা হল সংযম। জীবন চলার পথে ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা করে পথ চলার নাম তাকওয়া। নবীজির কাছে তাকওয়ার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছিল? তিনি একটি উপমা দিয়েছিলেন, মনে কর, তুমি একটি সরু কাঁচাপথ দিয়ে যাচ্ছ, দু‘পাশে লতাগুল্ম আছে, কাঁটাযুক্ত লতা পথের উপর নূয়ে পড়েছে। সেই পথ দিয়ে চলতে তুমি নিশ্চয়ই কাপড় গুটিয়ে সতর্কভাবে চলবে, যাতে কাঁটাদার লতাগুল্ম তোমার কাপড় কামড়ে না ধরে। জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজে এভাবে সতর্ক হয়ে চলাকে বলা হয় সংযম, তাকওয়া।
উদাহরণ স্বরূপ পানাহার। আমরা অতিরিক্ত ঝাল খাই না। মাছ খাওয়ার সময় মাছের কাঁটা আলাদা করে ফেলে দেই, কিছুতেই খাই না। কারণ, আমরা জানি কাঁটা গলায় বিঁধে যাবে। অতিরিক্ত ঝাল সহ্য করতে পারব না। পঁচা বাসি খাবারও খাই না। কারণ খেলে পেট খারাপ হবে, মারাত্মক ডাইরিয়া হয়ে যেতে পারে। পানাহারে এই বাছবিচার সবাই করে। ভালো মন্দ, মুসলমান কাফের সবাই বুঝে, মেনে চলে। কিন্তু মুসলমান হলে আরো কিছু বাছবিচার করে চলতে হয়। সেটি হল, হালাল-হারাম। দৃশ্যত ভালো সুস্বাদু তাজা খাবার হলেও মুসলমান খেতে পারে না, তাকে দেখতে হয় খাবার বা পানীয়টি হালাল কিনা।
হালাল মানে আল্লাহ ও রাসূলের বাণীতে, শরীয়তে অনুমোদিত বিষয়। কুরিয়ানরা আমাদের দেশে রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজ করে। মাঝে মধ্যে তারা কুকুর ধরে জবাই করে রান্না করে খায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা, চাকমা বৌদ্ধরা সাপ খায়। কোনো মুসলামন এগুলো খেতে পারে না, খায় না। সে হরিণের, গৃহপালিত পশুর গোশত খায়; কিন্তু হিংস্র বন্য প্রাণির গোশত সে খায় না। শিয়াল কুকুরের গোশত তার জন্য হারাম। এই যে, হালাল হারাম বাচবিছার করে চলা, এটিই ঈমানদারির পরিচয়, পানাহারে তাকওয়ার জীবন। এভাবে জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজে যারা সংযমী জীবন যাপন করে তারাই মুত্তাকী, তাদের চলার পথ দেখানোর জন্য কুরআন এসেছে পৃথিবীতে, ‘হুদাল লিল মুত্তাকীন’। শুধু মুখের কথায় বা উপদেশ শুনে এই তাকওয়া অর্জন করা যায় না। এর জন্য অনুশীলন লাগে, প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তাকওয়ার জীবনের এই প্রশিক্ষণ অনুশীলনের জন্যেই মাসব্যাপী কর্মশালা পবিত্র রমজান মাস।