
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি, জনগণের রায়ে বিএনপির সরকার গঠনের পর আমরা সেগুলো একের পর এক বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের সম্মানী দেওয়ার কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তারেক রহমান আরো বলেন, ‘সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন, তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য দূর করে আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব, জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এখন সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য আমরা এরইমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে এই কার্ড সারাদেশে সবাই পাবেন। আগামী ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ থেকে চালু হচ্ছে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’। ১৬ মার্চ (আগামীকাল) দিনাজপুর থেকে শুরু হচ্ছে খাল খনন কর্মসূচি।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আজ থেকে চালু হলো খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি। যাদের প্রয়োজন সারাদেশে তাদের প্রত্যেককে পর্যায়ক্রমিকভাবে এই সহায়তা দেওয়া হবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ তথা প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে।’ নাগরিক কিছু দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নাগরিকদেরও কিন্তু রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি কিছু দায় দায়িত্ব রয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমরা যদি যে যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, আমি আশা করি, আগামী ১০ বছরে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আমরা একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ দেখতে পাব।’
নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনও শক্তিশালী হতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে এমন একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ কিংবা তাবেদার অপশক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে। আমি বার বার একটি কথা বলি, নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনও শক্তিশালী হতে পারে না।’
ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র মানুষের জীবনে হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতাবোধ, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, সংহতি, সহনশীলতা, উদারতা, বন্ধুত্ব, বিনয়, দায় কিংবা দয়া, এই সব বৈশিষ্টগুলো অর্জন ছাড়া একজন ব্যক্তি মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না। এ ধরণের মানবিক বৈশিষ্টগুলো অর্জনের জন্য ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া জরুরি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিহিংসা এবং সহিংসতা’ মুক্ত একটি নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে ধর্মের উদারনৈতিক শিক্ষণীয় বক্তব্যগুলো অতুলনীয়। আমার বিশ্বাস, একটি নৈতিকতা সমৃদ্ধ মানব সমাজের গঠনের জন্য প্রতিটি ধর্মেই ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। সুতরাং, একটি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের মতো ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন মানুষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মহিবুল্লাহি বাকি, শায়েখে চরমোনাই ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম বক্তব্য রাখেন।
ইমামণ্ডপুরোহিতদের সম্মানি কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী : মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি দেওয়ার কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের হাতে সম্মানি তুলে দিয়ে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সম্মানি প্রদান কর্মসূচির আওতায় মসজিদের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা। মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার ক্ষেত্রে আট হাজার টাকা করে বরাদ্দ থাকবে। মসজিদের ইমামরা ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার টাকা, খাদেম ২ হাজার টাকা পাবেন।
মন্দিরের ক্ষেত্রে পুরোহিত ৫ হাজার টাকা ও সেবাইত ৩ হাজার টাকা পাবেন। বৌদ্ধ মন্দিরে বিহার অধ্যক্ষ ৫ হাজার টাকা ও বিহার উপাধ্যক্ষ ৩ হাজার টাকা এবং গির্জার ক্ষেত্রে যাজক ৫ হাজার ও সহকারী যাজক তিন হাজার টাকা করে পাবেন বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
প্রথম পর্যায়ে ঈদের আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়ন এবং প্রতিটি পৌরসভা থেকে একটি করে মোট ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলা থেকে ২টি করে মোট ৯৯০টি মন্দির, সারাদেশে ৭২টি উপজেলায় বৌদ্ধ বিহার অবস্থিত হওয়ায় প্রতিটি উপজেলা থেকে ২টি করে মোট ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহার ও ১৯৮টি উপজেলায় গির্জা অবস্থিত হওয়ায় প্রতিটি উপজেলা থেকে ২টি করে মোট ৩৯৬টি গির্জা সম্মানী দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোধে সবচেয়ে কার্যকর সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা- প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এডিস মশার কামড় থেকেই মানুষ ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই সবাইকে আগে থেকেই প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ কথা জানিয়েছেন।
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, বর্তমানে ডেঙ্গু নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নয়। যে কোনো সময়ই মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার বা বাড়ির ছাদে পানি জমতে দেবেন না। পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা জরুরি। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার বাসাবাড়ি এবং আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখুন।’ সরকার গতকাল শনিবার থেকে সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযান প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালে, আসন্ন দিনে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ার মতো মরণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।’
প্রধানমন্ত্রী জনগণকে সতর্ক করে আরও বলেন, ‘প্রতিরোধই প্রতিকার থেকে উত্তম। কোথাও ময়লা পানি জমে থাকতে দেবেন না। নিজের বাসাবাড়ি এবং আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিজের এবং অন্যের জীবন রক্ষা করুন।’