
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজার ও পোশাকশিল্পে। এরমধ্যেই পোশাকশিল্পে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি উৎপাদন কমেছে। তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে ভারতসহ অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে ধস নামার শঙ্কা দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টানা আট মাসেরও বেশি সময় ধরে এই খাতে রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী ধারা বা ধস অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রধান ১০টি গন্তব্য বা বাজারের মধ্যে ৯টিতেই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। শুধুমাত্র স্পেন ছাড়া অন্য সব শক্তিশালী বাজারগুলোতে বাংলাদেশ তার অবস্থান হারিয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই থেকে মার্চ) তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট ২৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, ১ বছরের ব্যবধানে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। উপখাতগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিটওয়্যার খাতের রপ্তানি আয় ১৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কম। একইভাবে ওভেন খাতের আয় ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে।
জ্বালানি সংকটে পোশাকের ক্রেতারা উদ্বিগ্ন, অন্য দেশে চলে যাচ্ছে অর্ডার : গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে ভারতসহ অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে। এক ক্রেতার সঙ্গে আলাপের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘সে বলছে, ‘শুনলাম যে তোমার দেশে তো আর দুই থেকে তিন মাস পরে ইলেকট্রিসিটি থাকবে না এবং তোমাদের এত অর্ডার দিতে এখন আমাদের টপ ম্যানেজমেন্ট থেকে না করা হচ্ছে, এটা কিন্তু এখন ইন্ডিয়াতে যাওয়া শুরু করেছে’।
আগামী জুলাই-আগস্টের কার্যাদেশ এখনই হারানোর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু বড় বড় বায়িং হাউস, ওরা এই মেসেজগুলো (কার্যাদেশ অন্যত্র চলে যাওয়ার) কিন্তু আমাদের দেওয়া শুরু করছে এবং আমরা কিন্তু এখন দেখছি যে জুলাই-আগস্টের অর্ডারগুলো থেমে গেছে। যেগুলো আসার কথা ছিল খুব স্লো হয়ে গেছে। খুব কষ্ট করে ডিসকাসন করা হচ্ছে (কার্যাদেশ পাওয়ার)।’ এমন পরিপ্রেক্ষিতে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ১ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার দাবি জানান তিনি। এছাড়া ব্যবসার ক্ষতি হওয়ার পরও ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম টার্নওভার কর দিতে হয়, যা ব্যবসার জন্য ‘বোঝা’; এটি কমানোর প্রস্তাব দেন তিনি।
সাভারের আশুলিয়া এলাকার পোশাক কারখানার পরিচালক সঞ্জয় কুমার বলেন, লোডশেডিং বাড়ায় পোশাক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দিনে ১০ ঘণ্টা কারখানা চালু থাকলেও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রায় এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি করে আসছেন। তিনি বলছিলেন, রপ্তানির বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করাটা যেমন জরুরি, তেমনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যগুলো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্যই বিদ্যুৎ না থাকলেও আমরা কাজ বন্ধ রাখতে পারি না। জেনারেটর দিয়ে হলেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে জেনারেটর চালানোর জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন, বর্তমান বাস্তবতায় সেটি জোগাড় করা মোটেও সহজ কোনো ব্যাপার নয়। ডিজেলের জন্য ছুটতে হচ্ছে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপরও জেনারেটর চালানোর জন্য অনেক সময় যথেষ্ট পরিমাণ ডিজেলও পাচ্ছি না। ফলে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি’র (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এনার্জি ক্রাইসিসের কারণ সার্বিকভাবে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
পোশাক ব্যবসায়ী সঞ্জয় কুমার বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করার জন্য ব্যবসায়ীরা জেনারেটর চালিয়ে কারখানার কাজ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় কারখানা সচল রাখতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আগে বিদ্যুৎ-ডিজেল মিলিয়ে প্রতি মাসে আমার খরচ হতো ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার মতো। কিন্তু জেনারেটর চালানোর কারণে সেটা এখন বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হয়ে গেছে।
জ্বালানি সংকটে গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন ধস ঠেকাতে বিজিএমইএর নতুন উদ্যোগ : বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন ধস ঠেকাতে বিকল্পব্যবস্থা হিসেবে প্রতিটি কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। এ উদ্যোগের আওতায় ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, পাশাপাশি সার্ভিস ফি-তে ৫০ শতাংশ মওকুফের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে সোলার প্যানেল আমদানি নীতিতে পরিবর্তন না আনলে এ উদ্যোগের সুফল মিলবে না বলে মনে করছেন গার্মেন্টস মালিকরা। মধ্যপ্রাচ্যেযুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে ভুগছে দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে জেনারেটর চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে অন্তত ৪০ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে সদস্য কারখানাগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য বিশেষ নোটিশ দিয়েছে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনাও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।
বিজিএমইএর পরিচালক মো. এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, যদি ইন্ডাস্ট্রি সোলার প্যানেল স্থাপন করে, তাহলে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হবে। অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান বাজারগুলোতে কঠোর পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স থাকায় সোলার প্যানেল স্থাপন এখন কৌশলগত ব্যবসায়িক শর্ত বলে মনে করে বিজিএমইএ। এজন্য ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে আগামী ৩ মাসের মধ্যে যেসব কারখানা সোলার প্যানেল স্থাপন করবে, তাদের সার্ভিস ফি-এর ৫০ শতাংশ মওকুফ করা হবে।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বিজিএমইএর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, এটি একটি যুগোপযোগী ও টেকসই উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশ এবং উদ্যোক্তা; উভয়ের জন্যই উপকার হবে। তবে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি নীতিতে জটিলতা থাকলে এই উদ্যোগ সফল হবে না। বিশেষ করে শুল্কহার ও নীতিগত বাধার কারণে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই তারা আমদানি নীতিতে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট এসআরও জারি করা প্রয়োজন, যাতে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হয়ে সোলার প্যানেল ব্যবহার করতে পারেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে ৪ হাজারের বেশি গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। পাশাপাশি ৮টি ইপিজেডে আরও প্রায় ৬০০ কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় আসে।
তবে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি নীতিতে জটিলতা থাকলে এই উদ্যোগ সফল হবে না। বিশেষ করে শুল্কহার ও নীতিগত বাধার কারণে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই তারা আমদানিনীতিতে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট এসআরও জারি করা প্রয়োজন, যাতে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হয়ে সোলার প্যানেল ব্যবহার করতে পারেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে ৪ হাজারের বেশি গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। পাশাপাশি ৮টি ইপিজেডে আরও প্রায় ৬০০ কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় আসে। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গাজীপুর বা আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে যতটা লোডশেডিং হচ্ছে, ইপিজেডে আমরা সেই তুলনায় বেটার পজিশনে আছি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, তারা যে প্রধান সমস্যা নিয়ে আসছিল- ফুয়েল ক্রাইসিস, সেটা আমরা তাৎক্ষণিকভাবেই সমাধান করে দিয়েছি। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নেতারা পোশাক ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা জ্বালানি কার্ড চেয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা সেটা করার বিষয়ে সম্মতি দিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে তাদের ট্যাগ করে দিয়েছি। এখন বিজিএমইএ তার সদস্যদের কার কতটুকু জ্বালানির দরকার, সেটা অনুযায়ী তালিকা করে ফুয়েল কার্ড দিবে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, জ্বালানি কার্ড দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা দেশের যেকোনো তেল পাম্প থেকে ‘অগ্রাধিকারভিত্তিক’ জ্বালানি তেল নিতে পারবেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরমধ্যেই এক হাজারের মতো কারখানা কার্ডের জন্য আবেদন করেছে এবং আমরা কার্ড বিতরণ শুরু করেছি।
পোশাকশিল্পের টেকসই অগ্রযাত্রায় তিন দফা প্রস্তাব বিজিএমইএর : বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিজিএমইএর প্রতিনিধিদলে ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী এবং পরিচালক মো. হাসিব উদ্দিন। বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমনটা জানানো হয়।
বৈঠকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাকশিল্পের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ এবং এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়। এ কঠিন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো নীতি সহায়তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বৈঠকে আরএসসি (আরএমজি সাসটেইনেবল কাউন্সিল) এর বর্তমান কার্যক্রম এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এর ভূমিকা নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি বিশেষ করে আরএসসির ম্যান্ডেট নিয়ে বিজিএমইএর অবস্থান তুলে ধরেন। আরএসসির কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, আরএসসি শুধুমাত্র ভবন, অগ্নি এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার তদারকির জন্য গঠিত হয়েছিল। বেতন, ছুটি বা ট্রেড ইউনিয়নের মতো সামাজিক কমপ্লায়েন্স বা ‘নন-ওএসএইচ’ বিষয়গুলো আরএসসির মূল এখতিয়ারের বাইরে। এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিজিএমইএ সভাপতি স্পষ্ট করে বলেন যে, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই মালিকপক্ষ ও স্থানীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা পোশাকশিল্পের টেকসই অগ্রযাত্রায় বেশকিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, যার মধ্যে রয়েছে- আমদানি ও বন্ড নীতি সহজীকরণ : ‘এফওসি’ ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে বর্তমান আমদানি নীতি সংশোধনের দাবি জানানো হয়। এছাড়া, বন্ডেড প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হতে নন-বন্ডেড প্রত্যক্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা পরিহারে আমদানি নীতি আদেশ অনুচ্ছেদ ২১ (৮) (ক) ও অনুচ্ছেদ ২১ (৮) (ঞ) দ্রুত সংশোধনের অনুরোধ জানানো হয়। আর্থিক ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: পোশাক রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনার ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আয়কর কর্তন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান বিজিএমইএ নেতারা। পাশাপাশি, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। বাণিজ্য সহজীকরণ ও সিআইপি মর্যাদা: তৈরি পোশাক রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে বিজিএমইএর প্রস্তাবনা অনুযায়ী ‘আমদানি নীতি ২০২৪-২০২৭’ এর সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের সিআইপি মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড স্বয়ংক্রিয় করার প্রস্তাব করা হয়।