ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

‘স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নে একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার

‘স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নে একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, ফসলের বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘স্মার্ট কৃষি’ কার্যক্রম বাস্তবায়নে একগুচ্ছ মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চালু হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’, যার মাধ্যমে সরাসরি ১০ ধরনের সেবা পাবেন কৃষকরা। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়ালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমি কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই খাত নানা চাপে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে গত ১৪ এপ্রিল কৃষক কার্ড চালু করা হয়। এর মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে উপকরণ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা, পণ্য বিক্রয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে আবহাওয়া ও বাজার তথ্যসহ নানা সুবিধা পাবেন। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপ দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত বীজ ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং কৃষিযান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি দিয়ে ট্রাক্টর, হারভেস্টারসহ যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করা।

জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চালু হয়েছে ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পতিত জমি চাষের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে সিলেট ও চরাঞ্চলে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

ধাননির্ভর কৃষি থেকে বেরিয়ে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ফুল চাষে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদের ঋণ, ফসল বিমা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুনর্বাসন সহায়তাও জোরদার করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন খাতে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বীজ ও উপকরণ দেওয়া হয়েছে। এতে উপকৃত হয়েছেন ২৫ লাখ ২২ হাজার কৃষক।

কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও রপ্তানিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, মিনি কোল্ড স্টোরেজ এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

গবেষণা ও উদ্ভাবনেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বারি, ব্রি ও বিনার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কম পানি, কম সার ও কম কীটনাশক ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা আমদানি করা হয়নি : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলাকালীন প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ইউনিসেফ আমাদের অনেক হেল্প করেছে। তারা হামের যে ভ্যাক্সিনেশন, সেটি খুব দ্রুততার সঙ্গে পাঠিয়েছে। ফলে আমরা ওষুধগুলো পেয়েছি। প্রায় দুই কোটি শিশুকে এই হামের ভ্যাক্সিনেশন আমরা দেব। তিনি বলেন, টেস্ট করার জন্য যে কিট রয়েছে, এটির স্বল্পতা রয়েছে, এটা সঠিক। এটির ব্যাপারেও সরকার কাজ করছে। এর মধ্যে অনেক কিট এসে পৌঁছেছে। খুব সম্ভবত একটি কিট দিয়ে তিন শিশুকে টেস্ট করা সম্ভব হয়। কিছু কিট এই মুহূর্তে সম্ভবত ঢাকার কাস্টমসে আছে, এয়ারপোর্টে আছে। সেগুলো আমরা দ্রুত ছাড়ানোর ব্যবস্থা ইনশাআল্লাহ করছি।

‘উর্দুভাষী বাংলাদেশিদের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে’ : উর্দু ভাষী বাংলাদেশি নাগরিকদের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্ন উত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। এ সময় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অধিক্ষেত্রাধীন পল্লবী থানায় বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী উর্দুভাষী বাংলাদেশি নাগরিকদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য অদ্যাবধি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। তবে বিস্তারিত সমীক্ষা করে পল্লবী থানার আওতাভুক্ত বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী উর্দুভাষী বাংলাদেশি নাগরিকদের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, উর্দুভাষী বাংলাদেশি নাগরিকের বসবাসের ক্যাম্পসমূহে ২০১৬ সালের পূর্বে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৪০ কোটি ২৭ রাখ ৭৮ হাজার ১৫৩ টাকা বকেয়া ছিল। গত ২৬ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আয়োজনে আন্তঃমন্ত্রণালয় বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির ১ম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যা পরিশোধের প্রক্রিয়াধীন।

শহরের এলজিআরডির অব্যবহৃত ২০০ ভবন পাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় : শহরাঞ্চলে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে অব্যবহৃত অবস্থায় থাকা প্রায় ২০০ ভবন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, মাস দুয়েকের ভেতরে এগুলো মাতৃসদন ক্লিনিকসহ শিশু ও নারীদের চিকিৎসার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। গতকাল বুধবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চলতি মাসের মধ্যেই প্রায় ২০০ এর মতো ভবনগুলোর হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে।’

শহর এলাকায় অব্যবহৃত পড়ে থাকা আবাসনগুলো স্বাস্থ্য খাতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান আরও বলেন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ২০০ এর মতো ভবন ছিল, যেগুলোর কোনো ব্যবহার ছিল না। কোনোটি পাঁচতলা, কোনোটি আটতলা। বর্তমান সরকার কিছু দিন আগে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, এগুলো আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিয়েছি।’

বাংলাদেশে আসছে পেপ্যাল, জানালেন প্রধানমন্ত্রী : দেশে তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বহুল প্রতিক্ষিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে আগামী ৫ বছরে ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান এবং উচ্চপ্রযুক্তিতে কয়েক হাজার তরুণকে প্রশিক্ষিত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

গতকাল (বুধবার) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় বিভিন্ন সংস্থা-দপ্তর তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর কর্তৃক ৫ বছরে ১০০০ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে এবং ৫ বছরে ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান করা হবে। এরইমধ্যে ৭৫০০ জন ফ্রিল্যান্সারকে ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ২০২৬ সালে ২৪০০ জনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং (এমএল), এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো উচ্চপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ত্বরান্বিত করতে ৮৩টি সেবা অনলাইনে প্রদান করা হচ্ছে এবং আগামী ১ বছরে আরও ১০টি নতুন সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হাই-টেক/সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপালের কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে এরইমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মাধ্যমে ২০টি ব্যাচে প্রায় ১ হাজার আন্ডার গ্র্যাজুয়েট-গ্র্যাজুয়েটদের আইটিইই (ইনফরমেশন টেকনোলজি ইঞ্জিনিয়ার্স এক্সামিনেশন) প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে। বিসিসির মাধ্যমে ৫ হাজার ২০ জন চাকরি প্রার্থী এবং ছাত্রছাত্রীকে এআই, মোবাইল অ্যাপ্স ডেভেলপমেন্ট, পাইথন প্রোগ্রামিং, ডাটা অ্যানালাইটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণসহ ১ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ৭০০ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত