
দীর্ঘ ৩৯ দিন যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি চলছে যুক্তরাষ্ট্রের। সেই বিরতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ‘শেষ’ হয়েছে। ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ আবারও যেকোনো সময় নতুন করে শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের যেকোনো ‘দুঃসাহসিকতা বা বোকামির’ জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত বলেও দাবি করেছে ইরান। ইরানের সামরিক সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
‘যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে’ ইরান যুদ্ধ শেষ হয়েছে- ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধবিরতি ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা ‘সমাপ্ত’ করেছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন নেই, নিজের এই যুক্তিকে আরও জোরালো করতে গিয়ে এমন কথা বলেছেন তিনি। রয়টার্স জানায়, গত শুক্রবার মার্কিন কংগ্রেসের নেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের সঙ্গে কোনো গুলি বিনিময় হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এ শুরু হওয়া যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলুশন’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান চালাতে পারেন, আর এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তা বিষয়ে অনিবার্য সামরিক প্রয়োজনে’ কংগ্রেসের অনুমতি প্রার্থনা বা সময় আরও ৩০ দিন বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে পারেন।
দুই মাস আগে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার ৪৮ ঘণ্টা পর ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসকে যুদ্ধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন। তারপর থেকে শুরু হওয়া ৬০ দিনের সময়সীমা ১ মে শেষ হয়েছে। তারিখটি এগিয়ে আসার সময় কংগ্রেসের সহাকারী ও বিশ্লেষকরা জানান, তারা ধারণা করছেন ট্রাম্প সময়সীমাটি এড়িয়ে যাবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার জানান, এক্ষেত্রে যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের সময়সীমাটি প্রযোজ্য হবে না বলে অভিমত তাদের প্রশাসনের। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি যুদ্ধ ক্ষমতা আইনটিকে অসাংবিধানিক বলে বিবেচনা করেন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট, উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই এই আইনটি সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করেছে, এমন যুক্তি তুলে এটি সংবিধান লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিষয়টি আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি।
গত শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফ্লোরিডার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা একটি যুদ্ধবিরতিতে ছিলাম, তাই এটি আপনাকে অতিরিক্ত সময় দিয়েছে।’ কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ট্রাম্পের এই যুক্তি বাতিল করে দিয়ে বলেছেন, ১৯৭৩ সালের ওই আইনে যুদ্ধবিরতিকে অনুমোদন দেওয়ার মতো কিছু নেই। আর ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অব্যাহত মার্কিন নৌ-অবরোধ শত্রুতা চলার প্রমাণ, যুদ্ধবিরতির না। মার্কিন সেনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য সেনেটর জিন শাহিন এক বিবৃতিতে ওই সময়সীমাকে ট্রাম্পের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘একটি পরিষ্কার আইনি সীমা’ বলে অভিহিত করে বলেছেন, ‘সংঘাতের ৬০ দিন পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এই দুর্বলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার কোনো কৌশল বা উপায় নেই।’ এই ডেমোক্র্যাটরা চান, যুদ্ধ চালিয়ে নিতে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি নিতে আসুক।
কংগ্রেসের কাছে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এই সংঘাতের সমাধান নাও হতে পারে। ইরান এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও এর সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি ‘উল্লেখযোগ্য’ হুমকি হয়ে আছে বলে দাবি করেছেন তিনি। গত শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য পাকিস্তানি মধ্যস্থতকারীদের কাছে তেহরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প দ্রুততার সঙ্গে ইরানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু, ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ তেহরান- ইরান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ যেকোনো সময় আবারও শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ‘দুঃসাহসিকতা বা বোকামির’ কড়া জবাব দিতে তেহরান ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ রয়েছে বলেও ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। ইরানের সামরিক সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।’ কারণ হিসেবে ইরানের সামরিক বাহিনী বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি বা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
তেহরানের মূল্যায়ন হলো, যুদ্ধ শুরুর আগের আলোচনা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই ইরান যথেষ্ট নমনীয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। ইরানের দাবি, তারা যখনই তাদের দাবি কিছুটা শিথিল করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ততবারই আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। কিছু অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান করা শান্তি প্রস্তাবটিতে ইরান তাদের কিছু দাবি বাদ দিয়েছিল। এর মধ্যে অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিও ছিল। এখন ইরান বলছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বড় বিষয় নিয়ে আলোচনার আগে হরমুজ প্রণালীর বর্তমান অবস্থা ও ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার’ বিষয়গুলোর সুরাহা করতে হবে। তবে বর্তমানে দুপক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। ইরান বলছে, আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তাদের ‘আত্মসমর্পণ’ করতে বলছে, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে তেহরানের ধারণা, যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেই অনুযায়ীই তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে আরও কড়াকড়ি, বিশেষ বলয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ইরানের : নিজেদের দক্ষিণ উপকূলীয় জলসীমায় নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণে ‘নতুন নিয়ম’ ঘোষণা করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতেই মূলত এ পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসি নৌ শাখার কমান্ড থেকে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আরব উপসাগর থেকে শুরু করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত ইরানের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বলয় গড়ে তোলা হবে। বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো, এ জলসীমাকে ‘ইরানের মানুষের জন্য গর্ব ও শক্তির উৎস’ এবং ‘এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা। প্রেস টিভি জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেওয়া এক নির্দেশনার পরদিন এই ঘোষণা এল। ওই নির্দেশনায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা আরব উপসাগরকে লক্ষ্য করে নীলনকশা সাজাচ্ছে, সেসব বিদেশিদের জন্য এই অঞ্চলে কোনো জায়গা নেই, একমাত্র সমুদ্রের তলদেশ ছাড়া তাদের আর কোথাও ঠাঁই হবে না।
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৬ মার্কিন সামরিক স্থাপনা : মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৬টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের সময় ইরান ও তার মিত্ররা আটটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে অবস্থিত অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এতে কিছু স্থাপনা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো কার্যত ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। খবর গালফ নিউজের। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর সংখ্যা ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বড় অংশজুড়েই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও পুরো স্থাপনাই ধ্বংস হয়ে বন্ধ করে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় মেরামতযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত রাডার ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত বিমান। এসব সরঞ্জাম অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কঠিন। এক কর্মকর্তা বলেন, তারা খুব হিসাব করে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং সীমিত সম্পদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। আমাদের রাডার সিস্টেমই সবচেয়ে দামি এবং সীমিত সম্পদগুলোর একটি।
এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার জুলস হার্স্ট তৃতীয় আইনপ্রণেতাদের জানান, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর মেরামতেই প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইস ইন্সিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি বাহিনী কুয়েতের আলি আল সেলিম বিমান ঘাঁটি, কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির একটি রানওয়ে এবং উত্তর ইরাকের একটি সামরিক ঘাঁটির অস্ত্রভান্ডারেও হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের প্রস্তাবে অসন্তোষ ট্রাম্পের : ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো ‘সম্ভাবনা নেই’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি তেহরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা এমন কিছু দাবি করছে যা আমি মেনে নিতে পারি না।’ গতকাল শনিবার আল জাজিরা এবং সিএনএন এসব তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়, ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ করা হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ‘আরও ভালো’ হতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক শক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপকারী ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ আইনকে ‘সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া কংগ্রেসকে দেওয়া এক চিঠিতে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রুতামূলক কার্যক্রম’ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরানকে কর বা ফি পরিশোধ করে বাণিজ্য করলে সংশ্লিষ্টদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। এ নিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও জানান, আগামী মাসে ট্রাম্পের চীন সফরের সময় হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে পেন্টাগন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইরান যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনা করার পর এ সিদ্ধান্ত আসে। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৫ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
এদিকে লেবাননের সংসদের স্পিকার নবীহ বেরি অভিযোগ করেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা ইসরায়েলকে ‘হামলা বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে’। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন, এর আগের দিন আরও ৩০ জনের বেশি প্রাণ হারান। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ইরানের জন্য স্থল বাণিজ্য পথ খুলে দিল পাকিস্তান : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সমুদ্রবন্দরে অবরোধের মুখে থাকা ইরানের জন্য নিজেদের স্থল বাণিজ্য পথ খুলে দিয়েছে পাকিস্তান। এর ফলে এখন থেকে পাকিস্তানের ওপর দিয়ে ইরানের পণ্য পরিবহন বা ট্রানজিট সুবিধা পাওয়া যাবে। এ পদক্ষেপকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চাপে রাখার যে চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ কি সেই চেষ্টাকে দুর্বল করে দেবে উঠেছে সেই প্রশ্ন। এ ছাড়া যুদ্ধ বন্ধে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনাতেই বা এর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের এ সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্য সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান তেহরানকে এই সুবিধা দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে নতুন কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
‘ট্রাম্প একজন নির্বোধ’, জ্বালানি তেলের দামে ফুঁসছে ক্যালিফোর্নিয়াবাসী : লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি তেল পাম্পে নিজের পিকআপ ট্রাকে তেল ভরছিলেন ২৮ বছর বয়সী রাইডার থমাস। চোখেমুখে তাঁর চাপা উত্তেজনা আর ক্ষোভ। পুরো ট্যাংক পূর্ণ করতে তার খরচ হয়েছে ১৩০ ডলার, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আগের তুলনায় ৩০ ডলার বেশি। ক্ষুব্ধ থমাস এএফপিকে বলেন, ‘তেলের দামে আমি যেমন ক্ষিপ্ত, কেন এ দাম বাড়ছে তা নিয়ে তার চেয়েও বেশি রাগান্বিত। ট্রাম্প একজন নির্বোধ, এছাড়া আর কিছুই নয়।’ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে দেশ দুটির হামলা শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে হু হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিনই এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না। থমাসের মতে, ‘এ যুদ্ধের কোনো দরকারই ছিল না। এটি ঠিক ইরাক আক্রমণের মতো, যেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।’ ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এ হামলা জরুরি ছিল এবং এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে মার্কিন চাপের মুখেও ইরান বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাসের এক–পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ কমায় ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি গ্যালন তেলের দাম ৬ ডলার (লিটারপ্রতি ১ দশমিক ৫৯ ডলার) ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল সাড়ে ৪ ডলার।
জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্য ও পোশাকসহ নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ডেভিড চাভেজ নামের এক ক্যামেরাপারসন অবশ্য পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করতে নারাজ। সাবেক ডেমোক্র্যাট সমর্থক চাভেজ অভিবাসন ও অর্থনীতি ইস্যুতে জো বাইডেনের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গত নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। চাভেজ মনে করেন, তেল কোম্পানিগুলো কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনিও ট্রাম্পের ওপর কিছুটা হতাশ।
জ্বালানি তেলের এ লাগামহীন দামের প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায়। তেলের দাম দিতে গিয়ে অনেককে এখন টান দিতে হচ্ছে খাবারের বাজেটে। ৭৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী ফ্লো জানান, চড়া দামের কারণে এখন তাকে গাড়ি চালানো কমাতে হয়েছে। পেনশনের সামান্য টাকা দিয়ে ঘরভাড়া দেওয়ার পর হাতখরচ চালানোও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্লো বলেন, ‘জীবন আগে থেকেই কঠিন ছিল, এখন তা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’
নৌ অবরোধে ৪৫টি জাহাজ ঘুরিয়ে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী- সেন্টকম : ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধে ৪৫টি জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তাদের দাবি, এসব জাহাজ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল। ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধের দায়িত্বে থাকা সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, মার্কিন বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল অব্যাহত রেখেছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলা নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। ৪৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা বন্দরে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে অবরোধের নিয়ম নিশ্চিত থাকে। যুদ্ধের মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা সরানোর সময় আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত : ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জানজান প্রদেশে অবিস্ফোরিত বোমা অপসারণের সময় বিস্ফোরণে ইসলামি রেভ্যলুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ১৪ সদস্য নিহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে ইরানের বার্তা সংস্থা ফারস এ কথা জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় আরও দুই সদস্য আহত হয়েছেন। নিহতরা আইআরজিসির একটি বিশেষ ইউনিটের সদস্য ছিলেন, যাদের ওই এলাকা থেকে অবিস্ফোরিত বোমা ও মাইন অপসারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
সংবাদ সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ওই এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমার কারণে প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর কৃষিজমি ঝুঁকির মুখে ছিল। মূলত সেই কৃষিজমিগুলো নিরাপদ করতেই এই বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছিল।