
বাবা শহীদ প্রেডিসেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত সিলেটের বাসিয়া নদীর খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল বেলা ১টা ২০ মিনিটে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে কোদাল হাতে নিয়ে মাটি কেটে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
সিলেট শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে কাশিপুর ইউনিয়নের এই বাসিয়া নদী সুরমা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত।
পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনে উপস্থিত এলাকাবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই যে বাসিয়ায় যে নদীটা আছে, এখানে যে খালটা— এটা সেই ৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করেছিলেন। তারপরে আবার এই খাল চলতে চলতে এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এই খালটা আমরা আবারো কাটতে চাই।
বাসিয়া নদীর এই খাল আবারো কাটার কারণ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই খাল যদি আমরা কাটি, প্রায় ৮০ হাজার কৃষক প্রথমত সরাসরি উপকার পাবে। এর বাইরে দেড় লাখ কৃষক পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। যাদের জমি-জমা আছে এই খালের দুই পাশে, ফসল যে উৎপাদন হয়— প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন ফসল বেশি উৎপাদন হবে।
তিনি আরো বলেন, শুধু এই খাল না, সারা বাংলাদেশে এরকম অনেক বাসিয়া খাল আমরা খনন করব। কারণ, আমরা যদি খালগুলো খনন করতে পারি, কৃষক ভাইদের জন্য সুবিধা হবে।
বিএনপির সরকার কৃষকবান্ধব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের সময় যখন এসেছিলাম, তখন আমি বক্তব্যে বলেছিলাম— বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে, আমরা কৃষক ভাইদের কৃষি কার্ড প্রদান করব। এই কাজ শুরু করেছি টাঙ্গাইল থেকে। গত মাসের ১৪ তারিখে আমি কৃষক কার্ডের উদ্বোধন করেছি। তারপর এখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের কৃষক ভাইদেরকে আমরা কৃষক কার্ড পৌঁছে দেব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে অনেকগুলো সুবিধা আমরা কৃষক ভাইদেরকে দেব, তাদেরকে ঋণের সুবিধা, সার-বীজ, কীটনাশকের সুবিধা সরকার থেকে সরাসরি দিতে পারব। আর সবচেয়ে বড় যে সুবিধাটা— তারা বছরে আড়াই হাজার টাকা পাবে। যেটা দিয়ে তারা নিজেরা কীটনাশক ওষুধ, বীজ সরাসরি কিনতে পারবে। সরকার থেকে সরাসরি আমরা তাদেরকে এই অর্থ সাহায্য করব।
কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা সুদসহ ঋণ মওকুফ করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই এ দেশের কৃষক ভাইয়েরা ভালো থাকুক, আমরা চাই গ্রামের মানুষরা ভালো থাকুক। গ্রামসহ সব মানুষই ভালো থাকুক। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। মেজরিটি মানুষ গ্রামে বসবাস করে, এজন্য এই মেজরিটি মানুষ যাতে দেশে ভালো থাকতে পারে সেটিই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য, সেটিই হচ্ছে আমাদের উদ্দেশ্য।
দেশের ৬০টি জায়গায় ইতোমধ্যে খাল খনন শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ঢাকা-সিলেট রুটে ‘সড়ক ও রেল’ যোগাযোগ উন্নত করা হচ্ছে : গতকাল সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন প্রাঙ্গণে এক সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার ঢাকা-সিলেট রুটে ‘সড়ক ও রেল’ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার কাজ শুরু করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট রুটে সড়কের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে প্রায় ১০ ঘন্টা সময় লেগে যায়। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙাচোরা থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আমি নির্বাচনী প্রচারের সময় এসে বলেছিলাম, আমরা সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে সিলেট-ঢাকা সড়ক নির্মাণের কাজে হাত দেব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘সরকার গঠনের পরে এ বিষয়ে সড়কের দায়িত্বে যে মন্ত্রণালয় আছে আমি তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, কাজটি যখন শুরু হয়, বিভিন্ন জায়গায় তাদের কোম্পানিগুলোর যে সাইট অফিস থাকে সেখানে ১১টিতে জমি অধিগ্রহণে সমস্যা রয়ে গেছে। এছাড়াও প্রশাসনিকও নানা জটিলতা রয়েছে।’
তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করছি দ্রুততম সময়ে আমরা এই কাজটি শুরু করতে পারব। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে তা শেষও করা হবে। ফলে ঢাকা টু সিলেট, সিলেট টু ঢাকা বাই রোডে যাতায়াতে মানুষকে আর এত কষ্ট ভোগ করতে হবে না।’
সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সুরমা নদীর দুই পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষে এই সুধী সমাবেশ হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় চাঁদনী ঘাট এলাকায় এ সমাবেশ শুরু হয়। প্রথমেই কোরআন থেকে তেলওয়াতসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়।
সড়কপথের চেয়ে রেলপথের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তা যতই বাড়াতে থাকি তত বেশি গাড়ি নামবে। ট্রাফিক বাড়বেই। এছাড়াও রাস্তা সম্প্রসারণের কারণে ফসলের জমিও নষ্ট হয়। তবে অবশ্যই রাস্তার উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন আমরা করব। কিন্তু মূলত রেলটাকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিতে চাই।’
সিলেট-ঢাকা রেলপথে ডাবল লাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সিলেট-ঢাকা রুটে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ বিষয়ে দ্রুত কাজ শুরু হবে এবং সিলেট-ঢাকা রেলপথে ডাবল লাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে আমরা কম খরচে যাতায়াত করতে পারবো। একই সাথে ব্যবসায়ীরাও কম খরচে তাদের ব্যবসায়িক মালামাল আনা-নেয়া করতে পারবেন। ‘
গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে সরকার বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ্ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর আদলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শহরের মানুষ স্বাস্থ্য সেবা পেলেও, গ্রামের মামুষ পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। তবে আমরা সচেতনতার মাধমে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি। এ লক্ষ্যে সারাদেশে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। এ সকল স্বাস্থ্যকর্মী সারাদেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পরামর্শ দেবেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সিলেট মেডিকেল কলেজের অধীনে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তীতে ১২’শ শয্যায় উন্নীত করা হবে। সিলেটে শিল্প-কারখানা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি আইটি খাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।’
সিলেটের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘জলাবদ্ধতার সমস্যা শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সারা দেশের একটি সাধারণ সমস্যা। জলাবদ্ধতা নিরসনে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনকে আমি অনুরোধ করব অবশ্যই আপনারা বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করবেন মানুষ যাতে সেবা পায়। কিন্তু একই সাথে যদি আপনারা মানুষকে সচেতন করার জন্য কতগুলো উদ্যোগ নেন, যেমন প্লাস্টিক অথবা পলিথিন কাগজসহ যে কোন বর্জদ্রব্য যেখানে সেখানে যাতে আমরা না ফেলি তার উদ্যোগ নিতে হবে।’
সিলেটে সৌন্দর্যবর্ধন ও বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেটের চাঁদনি ঘাটে সুরমা নদীর উভয় পাড়ের সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন।
তিনি গতকাল সকাল ১১টায় চাঁদনি ঘাটে এই প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান।
এছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় সংশ্লিষ্টরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই প্রকল্পের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী : ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’- এ স্লোগানকে সামনে রেখে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল শনিবার বিকাল ৫ টায় মহানগরীর রিকাবীবাজারে সিলেট স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে একটি লাল বাটন চেপে ট্রফি ও লোগো উন্মোচনের মাধ্যমে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
সারা দেশের জেলা স্টেডিয়ামগুলোতেও এ সময় ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন খুদে ক্রীড়াবিদরা।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পাশে ছিলেন।
সারাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্য থেকে প্রতিভা অন্বেষণে এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর যাত্রা শুরু হলো। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ গড়ে তুলতে আশির দশকের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘নতুন কুঁড়ি’র ধারাবাহিকায় এবার ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে এই কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার।
১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের সুপ্ত ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ, বাছাই এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে ক্রীড়া পরিদপ্তর; তত্ত্বাবধায়নে রয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেটে এসে হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেছেন ।
এখানে তিনি দেশ ও জাতির শান্তিকামনায় মোনাজাত করেন। এ সময় সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান তার সঙ্গে ছিলেন। এছাড়া সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রসাশক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে তারেক রহমান সকাল ১০ টা ৫ মিনিটে সিলেট ওসমানী বিমান বন্দরে এসে পৌঁছান।
বিমানবন্দরে নেমে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই প্রধানমন্ত্রী নগরের দরগাগেট এলাকায় অবস্থিত সুফিসাধক হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশে রওনা হন।
মাজারে যাওয়ার পথে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে হাজারো মানুষ জড়ো হন। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে তারা তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। তারেক রহমান নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান।
গত ২১ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা এই সিলেট থেকেই শুরু করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেদিন তিনি সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সিলেটে তারেক রহমানের এটি প্রথম সফর।