
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বিনা অপরাধে কোনো সাংবাদিক কারাগারে থাকবে না। নীতিগতভাবে সব সাংবাদিককে আইনের আওতায় পেশাগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে সরকার। তিনি বলেন, মানহানি মামলাসহ অন্যান্য আইনি জটিলতাগুলো প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় আনা হবে। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর তথ্য ভবন মিলনায়তনে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের দিবসে বাংলাদেশের প্রতিপাদ্য, ‘জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রধান সহযাত্রী স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম’।
মন্ত্রী বলেন, দেশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করবে সরকার। একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের আগে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি ‘পরামর্শক কমিটি’ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম একটি বিশাল ও জটিল ইকোসিস্টেম। তাই সরকার একা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না। আমরা একজন সর্বজনগ্রাহ্য গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞকে সামনে রেখে সব পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করব। এই কমিটির সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতেই একটি স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হবে। যার মাধ্যমে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’ ‘অবাধ তথ্য’ ও ‘অপতথ্য’ রোধের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অ্যালগরিদমের এই যুগে অপতথ্য রোধে আমাদের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা, তবে সেই তথ্য অবশ্যই দায়িত্বশীল ও ‘ক্লিন ইনফরমেশন’ হতে হবে।
সভায় আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রেস কাউন্সিলকে আরও কার্যকর করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিরও প্রয়োজন রয়েছে। অধিকারের সঙ্গে কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে এখতিয়ার ও সীমাবদ্ধতার তোয়াক্কা না করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের জন্য উচ্চমানের নীতি-নৈতিকতা ও পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা অপরিহার্য বলেও মনে করেন তিনি।
আলোচনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন- নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী; বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো’র মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম; সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ; জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ; বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী এবং ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম।
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কামাল উদ্দিন মজুমদার (সবুজ) এবং সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির (বাছির জামাল)। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে তথ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশে ‘দুর্দান্ত ভাইব্রান্ট মিডিয়া’ আবার হবে, এটা দেখতে চাই- তথ্য উপদেষ্টা : গণমাধ্যমকে শক্তভাবে সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রত্যেকে খুব স্ট্রংলি সরকারের যেকোনো ধরনের সমালোচনা, যৌক্তিক সমালোচনা কন্টিনিউ করবেন।ৃএই দেশে একটা দুর্দান্ত ভাইব্রান্ট মিডিয়া আবার তৈরি হবে, এটা আমি দেখতে চাই।’ তথ্য উপদেষ্টা মনে করেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গণমাধ্যমের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো বোকামি। এ কারণে বর্তমান সরকার এমন কিছু করতে চায় না, যা গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় জাহেদ উর রহমান এ কথা জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ডের শিকার হয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি নাকি বলেছি, জনগণের কল্যাণের জন্যই বেশি বেশি লোডশেডিং দিচ্ছে সরকার। একটা ফটোকার্ড আমার বন্ধুরা পাঠিয়ে বলছে, আমার মাথা কি গেল?’ এই ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার সময় তাকে ট্যাগ করে গালিও দেওয়া হয় বলে জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের ‘মিস ইনফরমেশন’ বা ‘ডিজইনফরমেশন’ সংবলিত ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।
এর পাশাপাশি একটি মূলধারার গণমাধ্যম তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ‘ফেক নিউজ’ তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ফেক নিউজ’ করা অন্যায়। এর বিরুদ্ধে সরকার আইনি পথে ও ন্যায্যতার সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে এবং গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য যেসব পদক্ষেপ আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
আলোচনায় ৫ আগস্টের পর আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, নোয়াবের (নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এই বিষয় উঠে আসে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছেন।
নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে এই সেল কাজ করবে বলে জানান তিনি।
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘নারীদের প্রতি সাইবারের ক্ষেত্রে আমরা জেনুইন গ্রাউন্ডে খুবই টাফ হতে যাচ্ছি।’ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, বিটিভির বার্ষিক বাজেট ৩২০ কোটি টাকার বেশি, অথচ প্রতিষ্ঠানটি আয় করে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকা। বেসরকারি গণমাধ্যমের বিকাশের এই সময়ে বিটিভি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, সরকার বিটিভিকে এমনভাবে গড়ে তুলবে যেন তা জনগণের কল্যাণে আসে।