
ব্যাংক খাতের যে সংকট চলছে, তার সমাধান না হলে অর্থনীতির ধস ঠেকান যাবে না বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। হোসেন জিল্লুর বলেন, এ জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব আছে। তার প্রশ্ন, যারা সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের আবার ফেরত আনতে আইনে নতুন ধারা কেন। ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম নামে সংগঠনের ব্যানারে এই সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের পাশাপাশি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল সকালে এই সেমিনার আয়োজন করা হয়। সভায় বক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যাংক খাতের লুটেরাদের ছবি জাদুঘরে প্রদর্শনের প্রস্তাব করেন। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাসেম হায়দার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিজানুর রহমান।
ছয় সমস্যা : প্রধান অতিথির বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করেন। তবে ছয়টি বিষয়ে সবাই একমত। এর টেকসই সমাধান করতে হবে।
ছয় সমস্যার মধ্যে রয়েছে- ১. অর্থনীতিতে বিপর্যয় হয়েছে; ২. কলুষিত নীতি প্রক্রিয়া অর্থনীতির সংকট ত্বরান্বিত করেছে, যা এখনও চলছে; ৩. আমানতকারীরা নীরবে দুঃখকষ্ট ভোগ করছেন; ৪. অর্থনীতি স্থবির অবস্থায় আছে, চাকা সচল হয়নি, বিনিয়োগ নেই, বেকারত্ব বাড়ছে; ৫. দেশের বড় পরিবর্তনের সংকট সমাধানের সুযোগ হিসেবে এসেছে; ৬. এই সংকটের টেকসই সমাধান প্রয়োজন, নৈতিকতার মানদণ্ডে যা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে হবে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেকেই ব্যাংক থেকে জমানো টাকা তুলতে পারছে না। এর সমাধান করতে হবে। গ্রাহক স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে কাজ করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি নৈতিকতার মানদণ্ডে দাঁড়াতে পারছে কি না, তাও দেখতে হবে। সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন খুবই জরুরি।
হোসেন জিল্লুর আরও বলেন, বেকারত্ব সমস্যার সমাধান না হলে সমাজে অন্য সমস্যা ছড়িয়ে পড়বে। এ জন্য সংকট সমাধানে নৈতিকভাবে উচ্চ স্থানে যেতে হবে। পেশাদারি ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে টেকসই সমাধান করতে হবে।
আরও আলোচনা : আলোচনায় ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া ব্যাংক খাত ঠিক হবে না। কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকগুলোতে যে লুটপাট হয়েছে, তার হিসাব পৃথক করে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাত হলো অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। এই খাতে লুট হলে অর্থনীতিতে বিপর্যয় হয়, এখন তাই হয়েছে। এখন ব্যাংক দখল নিয়ে যা বের হচ্ছে, তা দিয়ে থ্রিলার সিনেমা হতে পারে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি দখল করা ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। এখন অনেক ব্যাংকে টাকা তোলার লাইন পড়েছে। আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ব্যাংক পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের নতুন ধারা বাতিল করতে হবে।
সেমিনারে ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক ও পেশাজীবী বক্তব্য দেন। তারা বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দখল করা হয়েছিল। সে জন্য আগে থেকেই পরিবেশ তৈরি করা হয়। তখন সবাই চুপ ছিল। ২ শতাংশ শেয়ার থাকলেই একটি ব্যাংক দখল করা যায়, এটি কেমন সুযোগ। তখন গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে সরকারের বিবৃতি দেওয়ার প্রয়োজন। তারা আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকে আবার কিছু হলে আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না; এবার গ্রাহকেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।