
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা সম্প্রসারণে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। একই সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। আজ শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন হাকান ফিদান।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের বৈঠকে আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আমাদের সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা বিস্তৃত পরিসরে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জন্য যে কাজগুলো করা যেতে পারে, তা আমরা আলোচনা করেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে আমাদের সহযোগিতা বিকাশের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বিস্তৃত আলোচনা করেছি।’
হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে আমাদের অভিন্ন অবস্থান এবং সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছি।’
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। সমগ্র মানবতার পক্ষ থেকে একটি ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ এটি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী ও ন্যায্য সমাধান খুঁজতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ ও সংস্থার সঙ্গে সংহতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছি। তুরস্ক এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অ্যাজেন্ডায় রাখার জন্য নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ হাকান ফিদান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আমরা তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনে সমর্থন অব্যাহত রাখব।’ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে হাকান ফিদান বলেন, ‘আঞ্চলিক সংঘাত আগের চেয়ে বেশি বৈশ্বিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান দ্বন্দ্ব এবং অস্থিরতার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আমাদের সকলের জন্য গভীর উদ্বেগের।’ তার ভাষ্য, ‘ইরান যুদ্ধ নেতিবাচকভাবে আমাদের অঞ্চলের বাইরে সমগ্র বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে। এ ক্ষেত্রে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই।’
হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই আলোচনাগুলো সুনির্দিষ্ট ফলাফলে পৌঁছাবে এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি ভিত্তি প্রস্তুত করবে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে আসা বিশ্ব অর্থনীতি, শক্তি এবং নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি, যেকোনো বিরোধ কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আমরা আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছি।’
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘আমরা এই বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আমাদের পরামর্শ চালিয়ে যাচ্ছি। এই কাঠামোতে আমরা যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী করার জন্য পাকিস্তানের দেখানো মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাগুলোও দেখতে পাই এবং এই প্রচেষ্টাগুলোকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে চলেছি।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে যখন আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে, আমরা মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নিয়ে গভীর উদ্বেগ অনুভব করি। সে জন্য কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করে এমন পদক্ষেপগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এড়িয়ে যাওয়া উচিত।’
ফিলিস্তিন ইস্যুতে হাকান ফিদান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও যুদ্ধের অবসান ঘটাতে অভিন্ন ইচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি নাশকতার জন্য ইসরায়েলের প্রচেষ্টা ঠেকানো অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু সরকার ফিলিস্তিনে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ঠেকাতে পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ইসরায়েল গাজায় তার গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের গভীর ক্ষত খুলে দিয়েছে।’
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নিয়ে হাকান ফিদান বলেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের বহুমাত্রিক সহযোগিতার পরিধি এমনভাবে বিস্তৃত, যা গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কযুক্ত দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মানানসই। আমরা নতুন প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং সমৃদ্ধিকে সুসংহত করতে আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’
সফর উপলক্ষে বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা হয়েছে বলেও জানান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তুরস্ককে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দিতে চায় বাংলাদেশ : বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি তুরস্কের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রণোদনা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে তুরস্ককে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে খলিলুর রহমান বলেন, এই সফর বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্প, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধশিল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও তুরস্ককে দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তুরস্কে বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধও জানানো হয়। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি নাগরিক তুরস্কে বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী।
দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি, পর্যটন, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
এদিকে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও উঠে আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৯ বছর ধরে চলমান এ সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক সই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন ঢাকায় সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এ সময় ঢাকা-আঙ্কারা সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বন্ধু দুদেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন। পরে, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন খলিলুর রহমান এবং হাকান ফিদান। এখানেই স্বাক্ষর হয় সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সমঝোতা স্মারক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। শনিবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন হাকান ফিদান। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক সই। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর, এপ্রিলে হাকান ফিদানের আমন্ত্রণে তুরস্ক সফর করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।