
শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় জড়িত দেশীয় খুনিদের চিহ্নিত করা, পলাতক খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তেরও দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভ মিছিলে আগামী শুক্রবারের মধ্যে সরকার যদি হাদি হত্যাকারীদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা তাদের বিচার নিশ্চিত করতে সময়সীমা দিতে না পারে তাহলে জনগণকে নিয়ে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করারও ঘোষণা দেয় ইনকিলাব মঞ্চ। গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলটি মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে ওসমান হাদির সমাধিস্থলের সামনের রাস্তায় এসে শেষ হয়।
বিক্ষোভ মিছিল শেষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাস হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত সরকার ওসমান হাদির বিচারের ব্যাপারে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করতে পারেনি। সরকার বারবার বলছে হত্যাকারীকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া কিয়ামত পর্যন্ত চলবে কি না সেটা আমরা জানতে চাই।’
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল সেই বক্তব্য আমলে নিয়ে এর সত্য-মিথ্যা ঘটনা উদ্ঘাটন করার। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বললেন যে পরাজিত প্রার্থীর কোনো কথা তারা আমলে নিচ্ছেন না।
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে তারা নিজেদের পক্ষ থেকে আর কোনো দফা বা আলটিমেটাম দেবেন না। এখন আলটিমেটাম ও দফা সরকার দেবে বলে জানান তিনি।
ইনকিলাব মঞ্চ এখন চূড়ান্ত আন্দোলনের দফা বা আলটিমেটাম দেবে বলেও জানান আবদুল্লাহ আল জাবের। আগামী ৭ দিনের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট দুটি কথা শুনতে চান বলে জানান তিনি। আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘প্রথমত জাতিসংঘের অধীনে একটি তদন্ত হওয়ার কথা ছিল। জাতিসংঘ তদন্তের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে নাকি তারা বারণ করে দিয়েছে, এটা আমরা সরকারের কাছ থেকে শুনতে চাই। দ্বিতীয়ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে এটা সুস্পষ্ট যে হাদি হত্যায় ভারত ও বাংলাদেশের যোগসূত্র রয়েছে। তাই আমি মনে করি সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে কীভাবে এই খুনের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা যায় সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
জাবের কার অনুমতি নিয়ে মামলার বাদী হলেন, প্রশ্ন ওসমান হাদির বোনের : ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন তার বোন মাসুমা হাদি। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং কার অনুমতি নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এই হত্যা মামলার বাদী হলেন, তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে। গতকাল শুক্রবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে মাসুমা হাদি এসব কথা বলেন।
পোস্ট মাসুমা হাদি লেখেন, ‘আমি আমার ভাইয়ের মামলার বাদী হওয়া নিয়ে কিছুই বলতে চাচ্ছিলাম না। কারণ এর চেয়েও অনেক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র চালানো হয়েছে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে। সেই বিষয়েও এখন অব্দি আমি মুখ খুলিনি, শুধু আমার ভাইয়ের জন্য।” তবে দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামলার বাদী হওয়া নিয়ে যে ‘নোংরামি’ হচ্ছে, তার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করছেন বলে জানান।
মাসুমা হাদি উল্লেখ করেন, ‘ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়েই তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ছুটে যান এবং এক মিনিটের জন্যও ভাইয়ের পাশ থেকে সরেননি। তার প্রশ্ন- ‘প্রশাসনের লোক এভারকেয়ারে এসে জাবেরের কাছ থেকে স্বাক্ষর (সাইন) নিলো কেন? আর আমি উপস্থিত থাকাকালীন জাবের স্বাক্ষর দেবে কেন?’ এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাকে বোঝানো হয়েছিল যে, ওমরের (ওসমান হাদির ভাই) কাছে পুলিশ গিয়েছিল এবং ওমর তখন চিকিৎসার ব্যস্ততার কারণে পরে বিষয়টি দেখার কথা বলেছিলেন। মাসুমা হাদি মনে করিয়ে দেন, এ ধরনের ফৌজদারি মামলায় বাদীর স্বাক্ষর আগে-পরে হওয়া নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা থাকে না এবং পুলিশ চাইলেই স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতো।’
তখনকার বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে মাসুমা হাদি লেখেন, ‘একই রিকশায় দুই ভাই থাকায় ওসমান গণির (হাদি) রক্তে ওমর ফারুক রক্তাক্ত হয়েছিলেন। বুলেট আর একটা বের হলে ওমরও ওখানেই মারা যেতেন। ওসমান হাদিকে যেদিন সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়, সেই দিন সকালে ওমর এভারকেয়ারে বসে গোসল করে নিজের পোশাক ও হাতের ঘড়ি থেকে ভাইয়ের রক্তের দাগ পরিষ্কার করেন।’
এসময় তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘জাবের যদি আমার নলছিটির ছেলে না হতো, তবে কোনও প্রশ্ন ছিল না। কারণ ওসমান গণির সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন চলাফেরা করছে, এমন কোনও লোক নেই যারা জানে না যে ওসমান গণির জীবনে তার ছোট আপু কতটা জড়িয়ে আছে। সেই ছোট আপুর কাছে না এসে, কার অনুমতি নিয়ে জাবের মামলার বাদী হলো- এটা পরিষ্কার করতে হবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওমরের লাইফস্টাইল নিয়ে চলা ট্রলিংয়ের জবাবে মাসুমা হাদি জানান, ওমর হাতে যে ঘড়ি পরেন তা ৫ বছর আগে ১৭ হাজার টাকায় কেনা। এছাড়া ২০১৬ সালে তিনি ৩০ হাজার টাকার ব্লেজার এবং ৭০ হাজার টাকার মোবাইল ব্যবহার করতেন। না বুঝে কাউকে নিয়ে নোংরামি না করার অনুরোধ জানান তিনি।
চিকিৎসার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ‘হাসপাতালে অনেকেই দায়িত্ব নিতে চাইলেও পরিবার সায় দেয়নি। সর্বপ্রথম ওমর ফারুক ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫২ লাখ টাকা খরচ করে থাইল্যান্ডের টিকিট কেটেছিলেন। পরে সরকার এই সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে দায়িত্ব নেয় এবং দ্বিতীয় দফায় সিঙ্গাপুরে কাগজপত্র পাঠালে তারা তা গ্রহণ করে। এরপরই ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়।’
মাসুমা হাদি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একজন বিপ্লবীকে সম্মান করতে হলে তার পরিবারকে নিয়ে কীভাবে এত মিথ্যাচার করা যায়! সম্মান করতে না-ই পারেন, কিন্তু কিছু না জেনে অসম্মান করার অধিকার কোথায় পেলেন?’