
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের গুম, খুন, ভোট চুরি ও গণহত্যার বৈধতাদানকারী সাংবাদিকরা আইনের ঊর্ধ্বে নয় বলে জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলেও যারা গণতন্ত্র ধূলিসাৎ করার কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অধিবেশনে ফ্লোর নিয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বিগত ১৭ বছরের গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। বিগত ১৭ বছরের বৈরী পরিবেশেও অনেক পেশাদার সাংবাদিক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের সময়ে যেসব নামধারী সাংবাদিক গুম, খুন, ভোট চুরি, ব্যাংক ডাকাতি ও গণহত্যার বৈধতা দিয়েছেন এবং এগুলোর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট) করেছেন, তাদের বিষয়ে সরকার কী ভাবছে?’
আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে অভিযোগ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আজকে যারা সরকার দলে আছেন, বিশেষ করে বিএনপির সর্বোচ্চ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এই সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময় দেশদ্রোহী ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বসুন্ধরা গ্রুপের ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়াসহ কয়েকটি গণমাধ্যম বিএনপি-জামায়াত নেতাদের হত্যার পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করেছে। দুঃখজনকভাবে সেই নামধারী সাংবাদিকদের বর্তমানে বিভিন্ন হাউজে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের সাংবাদিকদের এখন টিভি চ্যানেল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে।’
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সময় টিভি দখল করা হয়েছে। গতকাল নোয়াখালীতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রলীগ যে ছাত্রদলকে পিটিয়েছে, সেটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া ও কিছু টকশো-জীবীকে উদযাপন করতে দেখা গেছে। এসব গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকার আদৌ কোনো আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে কি না বা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা আমি মন্ত্রীর কাছে জানতে চাই।’
হাসনাত আবদুল্লাহর একাধিকবিষয় যুক্ত করা দীর্ঘ প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী কিছুটা রসিকতার ছলে বলেন, ‘বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য একটি প্রশ্ন করলেন, নাকি কয়টি প্রশ্ন করলেন, আমরা সেই ট্র্যাকটা হারিয়ে ফেলেছি।’
এরপর প্রতিমন্ত্রী মূল জবাব দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা একটি কথা স্পষ্ট বলতে চাই, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, যারা গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার বিপক্ষে কাজ করবে, গণতন্ত্র ধূলিসাৎ করবে বা সন্ত্রাসের পক্ষে কাজ করবে, সে যেই হোক, সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’ অপরাধীদের বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে ইয়াসের খান চৌধুরী আরও বলেন, ‘অপরাধী সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবী, যেই হোক না কেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কেউ আইনের বিপক্ষে কাজ করলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে ও প্রধানমন্ত্রীর অধীনে গঠিত এই সরকার তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
শুরু হলো বাজেট অধিবেশন : জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে বসেছেন দেশের আইনসভার সদস্যরা; এই অধিবেশনেই আগামী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গতকাল রোববার বিকাল ৩টায় এই অধিবেশন শুরু হয়। সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অধিবেশনে উপস্থিত রয়েছেন। অধিবেশন শুরুতেই স্পিকার বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের কারণে এবারের অধিবেশন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
‘সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ কীভাবে দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে যথাযথভাবে ব্যয় হবে, তার একটি সুস্পষ্ট নীতিগত ও আর্থিক দিকনির্দেশনা এই অধিবেশনের মাধ্যমে জাতির সামনে উপস্থাপিত হবে।’ বৈঠকের শুরুতে সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা হলেন সেলিমা রহমান, ওসমান ফারুক, জয়নুল আবেদীন, মো. শাহজাহান ও শাহজাহান চৌধুরী। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তালিকার অগ্রবর্তী সদস্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। প্রথম দিনের কার্যসূচিতে রয়েছে সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন।
কার্যসূচি অনুযায়ী, সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোকপ্রস্তাব গ্রহণের পর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এদিন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে। জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ সংক্রান্ত কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধির আওতায় জমা পড়া নোটিশও নিষ্পত্তি করা হবে।
এরপর কার্যপ্রণালী বিধির ২১১(১) অনুযায়ী ‘সাম্প্রতিক জ্বালানি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন কমিটির সভাপতি ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বাজেট অধিবেশনের গুরুত্ব তুলে ধরে স্পিকার বলেন, সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়ের সমন্বিত বিবৃতি বা বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হয়।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৮৮, ৯০, ৯১ ও ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয়, নির্দিষ্টকরণ আইন, সম্পূরক ও অতিরিক্ত ব্যয় এবং হিসাব-সংক্রান্ত বিষয়ে সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। “ফলে বাজেট অধিবেশন শুধু আর্থিক পরিকল্পনা অনুমোদনের ক্ষেত্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাতীয় সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, বাজেট সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান নীতিগত ও আর্থিক দলিল। ‘তাই এই অধিবেশনে আপনাদের দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর ও গঠনমূলক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’