
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবীক্রম)। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭ শতাংশ। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ধীরে ধীরে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে। সে অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭.২৭ শতাংশ। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে মোট ব্যয়ের ৭২.৭৩ শতাংশ পরিচালন খাতে ব্যয় হলেও আগামী অর্থবছরে তা কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তায় জোর : বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০টি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, কৃষি, আর্থিক খাত, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষা : বাজেটে বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি : স্বাস্থ্য খাতে সবার জন্য মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে সরকার। স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে সেবার মানোন্নয়ন ও প্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগের কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা জোরদার : শিশু থেকে প্রবীণ- জীবনের প্রতিটি ধাপে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে চায় সরকার।
শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব : পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত খাত হিসেবে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ : বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সরকারি সেবাকে আরও স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী করার মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা : ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে বাজেটে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা অগ্রাধিকারে : অর্থমন্ত্রী জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। শিল্প ও উৎপাদন খাতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইসিটি রফতানিতে বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য : তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রফতানিকারক দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন গুরুত্ব : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জনগণের অংশগ্রহণে বনায়ন কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদ-নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
দক্ষ প্রশাসন গঠনের পরিকল্পনা : রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়িয়ে জনসেবার মান উন্নয়নের পরিকল্পনাও বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ঘোষিত এই ১০ অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
‘বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা’ : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস হতে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার প্রস্তাব করা হবে। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্বাহ করা হবে। তিনি জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করার প্রস্তাব করেন তিনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপকহারে ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই অবস্থা থেকে উত্তরণে ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়ন করছি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত হবে, অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাল্টিপ্লায়ার প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।’
বিনামূল্যে রেলভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা : সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আওতায় ৬৫ বছরের বেশি বয়সি জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে রেলভ্রমণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। তবে মেট্রোরেলে ভাড়া দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা ২৫ শতাংশ ছাড় পাবেন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এই অংশেই ৬৫ বছরের বেশি বয়সি নাগরিকদের জন্য রেলভ্রমণে এই সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অংশে বলা হয়, প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩৮ লাখে উন্নীত করা হবে এবং মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হবে। ভাতাপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১ লাখে উন্নীত করে এবং স্তরভেদে মাসিক ভাতা ১ হাজার থেকে ১৪০০ টাকা করা হবে। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা ও শিশুকে মাসে দেওয়া হবে ৮৫০ টাকা। ক্যান্সারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের এককালীন সহায়তা ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হবে।
ক্যান্সারসহ ৬ রোগে আক্রান্তদের সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব : নতুন অর্থবছরে ক্যান্সারসহ ৬ রোগে আক্রান্তদের সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ক্যান্সারসহ ৬টি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের এককালীন সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হবে। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্তদের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তার কর্মসূচি চালু রয়েছে।
নতুন অর্থবছরে এই এককালীন সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।’ বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
প্রতিবন্ধী ভাতা বেড়ে ১ হাজার টাকা হচ্ছে : প্রতিবন্ধী ভাতা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন অর্থবছরের বাজেটে। বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩৪ লাখ; জনপ্রতি ভাতা পাচ্ছেন ৯০০ টাকা করে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রতিবন্ধীদের ভাতা ১০০ টাকা বাড়ানোর পাশাপাশি সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৮ লাখ করা হবে। আর মাসিক ভাতা বাড়িয়ে করা হবে ১ হাজার টাকা। দেশে বর্তমানে ৮১ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভাতা পাচ্ছেন। নতুন অর্থবছরে সেই সংখ্যা ১ লাখে উন্নীত করা এবং স্তরভেদে মাসিক ভাতা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা করার প্রস্তাবও করেছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এটাই প্রথম বাজেট। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নতুন অর্থবছরে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
মোবাইলের সিম কার্ডে ৩০০ টাকা কর প্রত্যাহার : মোবাইলের সিম কার্ডের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা কর সম্পূর্ণভাবে তুলে নিল সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে যে দামে সিম বিক্রি হবে তার উপর ১৫ শতাংশ কর আদায় করা হবে।দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মোবাইল সেবা আরও সহজলভ্য করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এর ফলে এখন থেকে আরও কম মূল্যে সিম কেনা যাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে করের হার প্রায় ৫০ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। তাই এ খাতের বিকাশে সরকার এ ধরনের ট্যাক্স ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক হারে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘কর কমানোর উদ্যাগের অংশ হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মোবাইল সেবা আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।’ তবে এই সিদ্ধান্তে বড় অঙ্কের রাজস্ব ছাড় দিতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর প্রত্যাহারের ফলে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় কমবে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সরকার আইসিটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ লক্ষ্যে কর, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালায় ব্যাপক সংস্কার আনা হচ্ছে। সিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো। রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে সিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে আমরা স্বাগত জানাই। সিম কর প্রত্যাহারের ফলে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এখনও সংযুক্ত নয়, এমন জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সংযোগের আওতায় আসতে পারবে। এর মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগে তাদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পাবে।’ বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ খাতকে জাতীয় থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি এবং কিছু কর হ্রাসসহ এই খাতকে সহায়তায় সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলোকে আমরা স্বাগত জানাই। এই পদক্ষেপগুলো ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করতে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।’
হার্টের রিংয়ে ভ্যাট প্রত্যাহার, দাম কমতে পারে ২০ হাজার টাকা : হৃদ্?রোগের চিকিৎসা খরচ কমতে পারে। যেমন হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে প্রতিটি রিংয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে বলে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা দিয়েছেন। কিডনির সমস্যা নিয়ে অনেকেই ভোগেন। এ জন্য কিডনির সমস্যাজনিত রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ফিল্টারের দাম কমবে। এতে ডায়ালাইসিস বাবদ প্রত্যেক রোগীর খরচ ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া কিডনি রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানিতে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটের আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দেশে তৈরি মদে লিটার প্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট : দেশে উৎপাদিত মদের ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। তাতে করে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি উৎপাদিত প্রতি লিটার মদে ৫০০ টাকা করে সুনির্দিষ্ট কর বসবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থবিলে ভ্যাট আইনের তৃতীয় তফসিলের সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। এর আগে কেরুর উৎপাদিত মদের ওপর কেবল আবগারি শুল্ক ছিল; তাতে ভ্যাট ছিল না। কোম্পানিটি শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নির্দিষ্ট হারে আবগারি শুল্ক বা এক্সাইজ ডিউটি দিত। এখন নতুন করে ভ্যাট যুক্ত হওয়ায় দেশি মদ পানে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে সেবনকারীদের।
শিগগির ৫ হাজার চিকিৎসক ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ সরকারের : দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণ এবং জনবল সংকট দূর করতে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই ঘোষণা দিয়ে জানান, অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে যে, বিগত সরকারগুলোর টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবহেলা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হামণ্ডরুবেলা টিকা প্রদান করছে। নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি মাথায় রেখে এই বিশাল নিয়োগের ৮০ শতাংশই নারী কর্মী থেকে পূরণ করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স কোর্সের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয়-বৈদেশিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ৪ মাস মেয়াদি জেনারেল কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চালু করেছে সরকার। তিনি বলেন, ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআই ভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও ভবিষ্যতমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে।