
বর্তমান করকাঠামোতে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই করের বোঝা অনেক বেশি পড়ছে। সেই বিবেচনায় প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সিপিডি জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে করমুক্ত আয়ের যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী পর্যালোচনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ফাহমিদা খাতুন জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী ৫ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি প্রক্ষেপণ বা পথরেখা দেওয়া হয়েছে। যেমন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা একরকম থাকলেও ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা হবে ৪ লাখ টাকা। এর পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এই সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, করের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকা একটি ইতিবাচক দিক। এর ফলে করদাতারা আগে থেকেই জানতে পারেন যে কত আয় করলে কত টাকা কর দিতে হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনায় সাহায্য করে।
তবে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে এই সামান্য বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই করমুক্ত আয়ের সীমাটা আসলে বর্তমানে যে এত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সেটাকে কতখানি আসলে আমলে নিতে পেরেছে? করমুক্ত আয়ের সীমাটা আরেকটু বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে।’ ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘কর প্রস্তাবনায় সামগ্রিকভাবে অনেক ধরনের ভালো ভালো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। করপোরেট করের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য। এখানেও একধরনের পূর্বানুমান দেওয়া হচ্ছে।’
কালোটাকা সাদা করার সুযোগ করবৈষম্য বাড়াবে : বরাবরের মতোই অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা আবাসন খাতে (জমি, ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট) বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ বহাল রাখার সমালোচনা করেছে সিপিডি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘কালোটাকা সাদা করার এই সুযোগ করের ন্যায্যতা নষ্ট করে। যারা নিয়মিত ও সততার সঙ্গে কর দিয়ে আসছেন, তাদের সঙ্গে এটি একধরনের চরম বৈষম্য। এটি সমাজে নৈতিক স্খলনের ঝুঁকি তৈরি করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
কালোটাকা সাদা করা প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে এটা যুক্তিসংগত নয়, এটা নৈতিকভাবেও কাম্য নয়। কারণ, যাঁরা সঠিকভাবে দিচ্ছেন, তাঁদের জন্য এটা একটা অনুৎসাহ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিকভাবেও এটা ইতিবাচক নয়। কারণ, সাধারণ মানুষ মনে করেন যে যারা দুর্নীতি করেছে, কর ঠিকমতো দেয়নি, সরকার তাদের সুবিধা দিয়েছে আর আমাদের (সাধারণ মানুষ) ওপরে কর দেওয়া হচ্ছে।’
‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তি ঠিক নেই’
এদিকে প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাক্কলন নির্ধারণ করেছে, তার মূল ভিত্তি নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হিসাব যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভিত্তিটাই আসলে ঠিক নেই।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওপরে ভিত্তি করে একটা প্রাক্কলন করেছে। সেটা সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ, রপ্তানি, আমদানি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি- সবকিছুর জন্য গত অর্থবছরের আলোকে যে ভিত্তিটা করা হয়েছে, আমাদের বিবেচনায় সে ভিত্তিটাই কিন্তু ঠিক না।’
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতাকে আড়াল করে বা অতিমূল্যায়ন করে এই ভিত্তি বছরটি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এর ফলে সম্পদ আহরণ, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, আমদানি-রপ্তানি কিংবা সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা শুরুতেই একধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার মুখে পড়েছে। তাতে বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই দুর্বলভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে প্রাক্কলনগুলো করা হলে বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা অনেক বেশি সুদৃঢ় হতো। অথচ সরকারের সামনে সুযোগ ছিল প্রকৃত বাস্তবতা স্বীকার করে ভিত্তি ঠিক করা। কারণ, অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।