
বর্তমানে সব গ্রেডে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কার্যকর রয়েছে। কিন্তু নতুন খসড়া অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে তা হতে পারে ৪ শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে নতুন আলোচনার কেন্দ্রে এখন বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট। প্রাথমিক খসড়ায় বর্তমানের মতো সব গ্রেডে একই হারে ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে গ্রেডভেদে ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন।
বর্তমানে সব গ্রেডে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কার্যকর রয়েছে। কিন্তু নতুন খসড়া অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে তা হতে পারে ৪ শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে। প্রথম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হতে পারে। এর অর্থ হলো, নতুন কাঠামোতে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হচ্ছে। সরকারের যুক্তি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের কর্মীদের ওপর। তাই একই হারে ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে গ্রেডভেদে ভিন্ন হার নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কাগজে-কলমে এটি বৈষম্য কমানোর চেষ্টা। বাস্তবে কতটা হবে, সেটা গেজেট আর বেতন হাতে পাওয়ার পরই বোঝা যাবে। বেতন কাঠামোর সৌন্দর্য সাধারণত টেবিলে বেশি থাকে, বাজারে কম।
নতুন ইনক্রিমেন্ট কাঠামো নির্ধারণের আগে সরকার ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মতামত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জরিপে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বর্তমান ইনক্রিমেন্ট পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পক্ষে মত দেন। আরও ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণ করা উচিত। এই মতামত থেকে বোঝা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের বড় অংশ বর্তমান বেতন বৃদ্ধির নিয়মে সন্তুষ্ট নন। বিশেষ করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার বেশি হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ আসছে নিচের গ্রেড থেকে। কারণ বাজারে চাল, ডাল, বাসাভাড়া বা চিকিৎসা খরচ গ্রেড দেখে কমে না।
জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। এতে সর্বনিম্ন ধাপের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। কমিশনের সুপারিশে চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব থাকলেও সেটি কমিয়ে ৩ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তের কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসেছে। সন্তানদের শিক্ষা ভাতাও প্রস্তাবিত ২ হাজার টাকার বদলে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানের তুলনায় এসব ভাতা বাড়বে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে, আর বিভিন্ন ভাতা ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতাসহ মোট প্রাপ্তি প্রায় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। নতুন পে-স্কেলে ওই গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে ভাতাসহ মোট প্রাপ্তি ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়া এখনও চূড়ান্ত নয়। নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট এখনও প্রকাশ হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হচ্ছে, গেজেট প্রকাশে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। তাই এখনকার হিসাবকে সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে দেখা জরুরি, চূড়ান্ত বেতন তালিকা হিসেবে নয়।
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সরকারের ব্যয়। জাতীয় বেতন কমিশনের হিসাবে সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে পে স্কেল বাস্তবায়ন শুধু চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি বাজেট, রাজস্ব, পেনশন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
নতুন পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্টের নিয়ম বদলালে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মীরা তুলনামূলক বেশি স্বস্তি পেতে পারেন। তবে সেই স্বস্তি কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে গেজেটে কী থাকে, ভাতা কবে কার্যকর হয়, এবং বাজারদর কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকে তার ওপর।
নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব চলতি মাসেই মন্ত্রিসভায় : সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রস্তাব চলতি মাসের মধ্যেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। কমিটির সুপারিশে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং পেনশন কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫’-এর সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী সপ্তাহে আরেকটি বৈঠকের পর কমিটির সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে গেজেট জারি করে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন এবং আগামী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের পক্ষে মত দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। তবে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা।
আলোচনায় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি উঠে আসে। তবে, সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বৃদ্ধি হবে না। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম থেকে নবম গ্রেডে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এ ছাড়া, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা পুনর্বিন্যাস, কয়েকটি ভাতা একীভূতকরণ এবং অবসর-সুবিধা ও পেনশন কাঠামো সংস্কারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয় ২০১৫ সালে। পরে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন মূল বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।