
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে যেসব অংশ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, শুধু সেগুলো বাতিল করে বাকি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এই আর্জি জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। শুনানিতে তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ ও জাহিদ বিন আমজাদ।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ। এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেছে আদালত।
শুনানি শেষে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালতের বদলে সংসদে মীমাংসা হওয়ার ওপর জোর দিয়ে শিশির মনির বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি কি হবে? প্রস্তাবনায় কী থাকবে? অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ তে কী থাকবে? এবং ২৫ এর ২ এ কী থাকবে? এগুলো মূলত নীতি নির্ধারণী ব্যাপার।’
‘আমরা বলেছি নীতি নির্ধারণী ব্যাপারগুলো মূলত সংসদের দায়িত্ব। একটা প্রোপার বিতর্ক করে সাংবিধানিক বিলের মাধ্যমে কোনটা গ্রহণ করবে কোনটা করবে না— এই দায় দায়িত্ব পার্লামেন্টের।’
আদালতের এখতিয়ার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ (সেপারেশন অব পাওয়ার) তত্ত্বের কথা তুলে ধরে এ আইনজীবী বলেন, ‘আদালতের সেখানে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আদালত যদি সেই অংশে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সংসদের যে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আছে, তা খর্ব করা হয়।’
‘আমরা এটাও বলেছি যে আদালতের কখনও সুপার লেজিসলেটরের ভূমিকা পালন করা উচিত নয়। আদালত যদি কোনো নীতিকথা কিংবা কোনো রাজনৈতিক বিষয় সেটেল করতে যায়, তাহলে আদালতকে একটা বড় বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়।’
রাজনৈতিক বিষয়গুলো সংসদে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে এ শিশির মনির বলেন, ‘এই বিতর্কে জড়ানো আদালতের কাজ না। এই বিতর্কে কে জড়াবে? এই বিতর্কে জড়াবে সংসদ। সরকারপক্ষ ও বিরোধী দল বিতর্ক করে কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক এটা নির্ধারণ করবে।’
‘সেজন্য আমাদের সাবমিশন হল ফান্ডামেন্টাল প্রিন্সিপাল অব স্টেট পলিসি বা নীতিকথা বা মৌলিক বা প্রস্তাবনায় যে সমস্ত পরিবর্তনের সূচনা করা হয়েছিল, এগুলো যেন আদালতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সংসদ সেগুলো বিতর্ক করে জুলাই চার্টারের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো আদালতের বাতিল করা উচিত মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, ‘যেমন ধরুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ করে দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি না থাকে, তাহলে ডেমোক্রেসি থাকে না। ডেমোক্রেসি না থাকলে সংবিধান, রাষ্ট্র, প্রতিযোগিতা সবকিছুই ব্যাহত হয়।’
‘এইজন্য আমরা বলেছি, যে সমস্ত বিষয় বেসিক স্ট্রাকচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলোর ব্যাপারে উচ্চ আদালত যেন তার রায় প্রদান করেন।’
আদালত সীমার বাইরে গেলে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ভারসাম্য নষ্ট হবে মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, ‘সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এই ধরনের কোনো ফাইন্ডিংস কিংবা এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আদালতের নেওয়া ঠিক হবে না। যদি আদালত এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটাকে বলবে এনক্রোচমেন্ট অব জুডিশিয়াল রিভিউ। অর্থাৎ বিচার বিভাগ আইনের বাইরে গিয়ে তার দায়িত্ব পালন করতে গেলে গণতন্ত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় সিস্টেমে তিন অর্গানের ব্যালেন্স বজায় রাখা সম্ভব হবে না।’
পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে- এমন প্রশ্নে বাকশাল ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টানেন শিশির মনির। তিনি বলেন, ‘চ্যাপ্টার সিক্সের ‘এ’ যদি এখন বাতিল করে দেন, পুরোটা মিলে যদি আপিল বিভাগ বাতিল করে দেন, তাহলে আমরা অনিবার্যভাবে বাকশাল ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাব। তাহলে বাংলাদেশের ডেমোক্রেসি বলতে তো আর কিছু থাকবে না। এখন যদি আদালত বাদ করে দিয়ে বলেন ‘ইয়েস, আমরা বাকশাল সিস্টেমে চলে গিয়েছি’, আমরা বলছি ‘নো’। ইট ইজ নট দ্য ফাংশন অব দ্য কোর্ট। ইট ইজ দ্য ফাংশন অব দ্য পার্লামেন্ট।
‘ডেমোক্রেসি যদি ঠিক না থাকে, সিক্সের ‘এ’ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? কীভাবে দেশ চলবে? ডেমোক্রেসি কিভাবে বিলীন থাকবে? এখন আমরা আর্গুমেন্ট যদি করি যে এ টু জেড যা কিছু আছে সব বাদ করে দেন, তাহলে তো এটাও বাদ হয়ে যাবে এবং বাতিলটা বাদ হয়ে যাবে।’
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মত নীতিগত বিষয়গুলো ‘আদালতের কাজের পরিধির বাইরে’ বলে দাবি করেন জামায়াতের আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রে থাকবে কি থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত কি আদালত নেবে, নাকি এই সিদ্ধান্ত পার্লামেন্ট নেবে? এখন যদি আমরা বলি ইন ইটস এনটায়ারটি বাতিল করে দেন, তাহলে তো সেকুলারিজম বাতিল হয়ে যাবে, সোশালিজম বাতিল হয়ে যাবে।’
‘সেকুলারিজম, সোশালিজম যদি আদালত বাদ দেয়, এটি আদালতের ফাংশন না। কারণ এটি নীতিকথা। এটি হল রাষ্ট্রের গাইডিং প্রিন্সিপাল। এটাকে বলা হয় পোলস্টার। পোলস্টার আদালত ঠিক করে না, পোলস্টার ঠিক করে পার্লামেন্ট। অতীতে দেখেছেন, যখনই রাজনৈতিক বিতর্ক আদালত সেটেল করতে গিয়েছে, সে সমস্ত জায়গায় আদালত নিজেই বিতর্কিত হয়েছে।’
আদালতকে আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকার অনুরোধ জানিয়ে শিশির মনির বলেন, রাজনৈতিক বিতর্ক সংসদেই হওয়া উচিত।
‘আমরা যদি আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে বসে, আদালতের বারান্দায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাই, তাহলে জনগণের মধ্যে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমাদের তা করা উচিত নয়।’
পঞ্চদশ সংশোধনীর কোন বিষয়গুলো আদালতের বাতিল করা উচিত এবং কোনগুলো সংসদের জন্য রেখে দেওয়া উচিত, তা স্পষ্ট করতে শুনানিতে একটি তালিকা জমা দেওয়ার কথা বলেন জামায়াতের আইনজীবী। তিনি বলেন, সংশোধনীর বিষয়গুলোকে তারা আইনি বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুটি ভাগে বিভক্ত করে আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
এর মধ্যে প্রথম ভাগে থাকা নীতিগত বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একভাগে আমরা দেখিয়েছি যেগুলো নীতি এবং পদ্ধতির কথা। যার সংখ্যা প্রায় ৪১টা। এই নীতি পদ্ধতিগুলো বাদ করা ঠিক হবে না, হাত দেওয়া ঠিক হবে না। এগুলো বাদ দেবে কি দেবে না, এটা ডিসাইড করবে পার্লামেন্ট।’ অন্যদিকে, দ্বিতীয় ভাগে থাকা বিষয়গুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সেগুলো আদালতকেই বাতিলের আর্জি জানান এই আইনজীবী, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল সংক্রান্ত কোনো আইনি জটিলতা বা সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়।
শিশির মনির বলেন, ‘আমাদের সর্বশেষ সাবমিশন হল, আদালতকে তার মর্যাদা ঠিক রাখতে হবে, ইনডিপেন্ডেন্স ঠিক রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিতর্কে ঢোকা ঠিক হবে না। পার্লামেন্টকে ডিসাইড করতে দিতে হবে নীতি পদ্ধতিগুলো। আর আদালত ডিসাইড করবে মৌলিক স্তম্ভগুলো। এটিই আমাদের সাবমিশন।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট মামলার নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয় হাইকোর্টের রায়ে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’-কে ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয় ওই রায়ে।
৭ (ক) অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। আদালত একে অস্পষ্ট ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ৭ (খ) অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। হাইকোর্ট বলেছিল, এটি পরবর্তী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা খর্ব করেছে।
সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা ছিল। আর ৪৪ (২) অনুচ্ছেদে বলা ছিল ‘এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোন আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ঐ সকল বা উহার যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন। আদালত একে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে বাতিল করে দেয়।’
হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের কথা ছিল, যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪২ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বিবেচনায় তা বাতিল ঘোষণা করা হল এবং দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হল। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে।
ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রিট মামলার বাদীপক্ষ।
এখন সর্বোচ্চ আদালতে সেই আপিল শুনানি চলছে। মামলাটির চার পক্ষের মধ্যে বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেছেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। এরপর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিশির মনির। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে- শরীফ ভূঁইয়া : বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে রিটকারী আইনজীবী বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে,সংবিধান ধ্বংস করা হয়েছে। এ সংশোধনী পুরোটা বাতিল হওয়া উচিত। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে শুনানিতে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। গত বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শুরু হয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হয়।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।
গত ৩ নভেম্বর হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। আপিলে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চাওয়া হয়েছে। রিটকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ আপিল দায়ের করেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে এনেছেন উচ্চ আদালত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হয়নি এই রায়ে।
আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছন, গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এই গণতন্ত্র বিকশিত হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি। যার ফলশ্রুতিতে হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। পঞ্চদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।
রায়ে আদালত বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয়, ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে।
গণভোটের বিষয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়, যেটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।
হাইকোর্টের রায়ে ৭ ক, ৭ খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়েছে। ৭ ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭ খ সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। এদিকে ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা রয়েছে। এই অনুচ্ছেদের ২ ধারা বলছে, এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওইসব বা এর যে কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করতে পারবেন। এই অনুচ্ছেদটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে রায়ে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব পৌনে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান (বর্তমানে আইনমন্ত্রী), ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদ উদ্দিন। রিটকারী প্রতিষ্ঠান সুজনের সম্পাদক বদিউল আলমের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরিফ ভূঁইয়া। বিএনপির পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল। জামায়াতের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, ব্যারিস্টার এহসান সিদ্দিকী। ইনসানিয়াত বিপ্লবের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। চার আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার জুনায়েদ আহমেদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ, ইন্টারভেনর হিসেবে ছিলেন ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ, সেন্টার ফর ল’ গভর্নেন্স ও পলিসির পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী। গত বছরের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেছিলেন। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এ রুল জারি করেন। পরে রুলে পক্ষভুক্ত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরাম ও চার আবেদনকারী রুলে ইন্টারভেনর হিসেবে পক্ষভুক্ত হন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। এছাড়া বেশকিছু বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়।