ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আট শিশু নিহত

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আট শিশু নিহত

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টানা বর্ষণে পাহাড়ধসে একটি নারী মাদ্রাসা ও হেফজখানা ধসে অন্তত আট শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন, যাদের মধ্যে ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটার দিক ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) ও উমাইসা বিবি (১৩)। উম্মে নেজাতুল ও উম্মে সালমা দুই বোন। তারা ক্যাম্প-৩এর বাসিন্দা। অপর দুজন ক্যাম্প-৫-এর বাসিন্দা। বাকি চারজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। আহতদের মধ্যে আসরা (৯), বেগম জান (১৫) ও ফারেসা বিবি (১২)-এর পরিচয় জানা গেছে।

প্রশাসন জানিয়েছে, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং পরিচয় যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও প্রাথমিকভাবে আটজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, টানা বর্ষণে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে খতিজাতুল মহিলা হেফজখানা এবং পাশের মসজিদুল কুবা মসজিদের দেয়ালের ওপর পড়ে। এতে দেয়াল ভেঙে হেফজখানার কক্ষটি ধসে যায়। সে সময় সেখানে শিক্ষার্থীরা পাঠ নিচ্ছিল।

স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক রফিক বলেন, দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় প্রায় ৫০ জন ছাত্রী ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ জন বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বাকিরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। বিকেলে প্রথমে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হলেও পরে উদ্ধার অভিযান শেষে মৃতের সংখ্যা আটজনে পৌঁছায়।

ক্যাম্প-৫-এর বাসিন্দা মৌলভি ইউনুস বলেন, ‘মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার আর কয়েক মিনিট বাকি ছিল। এর মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল।’

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি ঢালের নিচে অবস্থিত মাদ্রাসাটির ওপর পাহাড়ের ঢাল ভেঙে পড়ে। স্থানীয় উদ্ধারকারী ও মেডিকেল ফোকালদের কাছ থেকে আটজনের লাশ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা নিজেরা লাশ দেখেননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহত দুই শিশুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আর কেউ নিহত হয়েছেন কি না, সেটি খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি দল উদ্ধারকাজ চালিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও ক্যাম্প প্রশাসন সার্বিক তদারকি করছে।’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ফায়ার সার্ভিস ও ক্যাম্প প্রশাসনের সিসিসিএম স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় বিকেল পাঁচটার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। পুরো কার্যক্রম আরআরআরসি কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

এপিবিএন-১৪এর প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, দেয়াল ধসের ঘটনায় প্রথমে সাতজন ছাত্রী আহত হন। স্থানীয়রা তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে সমন্বিত উদ্ধার অভিযানে মোট ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অতিবর্ষণের ফলে এফডিএমএন ক্যাম্প-৫-এর ব্লক-৩ এলাকায় মসজিদুল কুবা মসজিদের দেয়াল ধসে পাশের নারী হাফেজখানাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পরপরই সিআইসি, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন, আরআরআরসি কার্যালয়, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, এপিবিএন, ক্যাম্প প্রশাসন এবং স্থানীয় লোকজন যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন।

আরআরআরসি কার্যালয় ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বর্ষা শুরুর আগে থেকেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি সম্পর্কে ক্যাম্পগুলোতে মাইকিং করে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের দাফনের কার্যক্রম চলছে।

স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্র জানায়, মাদ্রাসাটিতে অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। অধিকাংশ বেরিয়ে যেতে পারলেও পাহাড়ঘেঁষা একটি কক্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর হঠাৎ মাটি ধসে পড়লে তারা আটকা পড়েন। নিহতদের অধিকাংশ ওই কক্ষেই ছিলেন।

এর আগে গত সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ, ৯ জনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে কক্সবাজারে ভারী বর্ষণজনিত বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভূমিধসে ৩৭ জন নিহত এবং অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে দুই দিন আগে আরেকটি পাহাড়ধসে নয়জন রোহিঙ্গার প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ ঘটনাটি আবারও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত