ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হাইকোর্টের রায় বহাল

সংবিধানে ফিরল গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা

সংবিধানে ফিরল গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা

বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্তও বহাল রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে এ রায় দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল। পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানে ৭ক, ৭খ বাতিলের রায় বহাল থাকল। আল্টিমেটলি (শেষ পর্যন্ত) হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।’

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটের পক্ষে ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এর আগে, গত বুধবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়। টানা তিন দিন শুনানি শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন ধার্য করা হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটের পক্ষে ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। গত বছরের ১৩ নভেম্বর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।

আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক। গত ৩ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। আপিলে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চাওয়া হয়েছে।

রিটকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ আপিল দায়ের করেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে এনেছেন উচ্চ আদালত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হয়নি এই রায়ে। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এই গণতন্ত্র বিকশিত হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি। যার ফলশ্রুতিতে হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। পঞ্চদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। রায়ে আদালত বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয়, ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে। গণভোটের বিষয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়, যেটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো। হাইকোর্টের রায়ে ৭ ক, ৭ খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়েছে। ৭ ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭ খ সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। এদিকে ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা আছে। এই অনুচ্ছেদের ২ ধারা বলছে, এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওইসব বা এর যে কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করতে পারবেন। এই অনুচ্ছেদটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে রায়ে।

গত বছরের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেছিলেন। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এ রুল জারি করেন। পরে রুলে পক্ষভুক্ত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরাম ও চার আবেদনকারী রুলে ইন্টারভেনর হিসেবে পক্ষভুক্ত হন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতিরজনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। এছাড়া বেশকিছু বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়।

পঞ্চদশ সংশোধনীতে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছিল : পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম বড় পরিবর্তন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে এটি পাস হয়। এর আগে একই বছরের জুনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সংসদে সংশোধনী বিলটি উত্থাপন করেন। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অন্তত ৫৪টি জায়গায় পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা এবং নির্বাচিত সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রাখা হয়। এছাড়া, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধানও বাতিল করা হয়। সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়, যেখানে সংবিধান বাতিল, স্থগিত বা এর মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে কঠোর বিধান রাখা হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি-জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি সংবিধানে ফিরিয়ে আনা হয়, তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি প্রদর্শনের বিধানও করা হয়। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। তবে সংশোধনীর কিছু বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়। বিশেষ করে সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ শব্দগুচ্ছ বাদ দেওয়া নিয়ে ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। কয়েকটি ইসলামপন্থী দল এর প্রতিবাদে কর্মসূচি দেয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও সেই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানায়।

কীভাবে পাস হয়েছিল এই সংশোধনী : ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ওই দিন সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের ৩৯ জন সংসদ সদস্য এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) একজন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। সংসদে থাকা একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেন। আর পক্ষে ভোট পড়ে ২৯১টি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল চেতনার কিছু বিষয় ফিরিয়ে আনাই ছিল এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত