
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ অনুসন্ধানে নেমে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং ১০ শিল্প গ্রুপের ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করার তথ্য দিয়েছেন বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ প্রধান বলেন, ‘অর্থপাচারের ১১টি যৌথ তদন্তের ঘটনায় আদালতের আদেশে ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে আছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা, আর বিদেশে ১৯ হাজার কোটি টাকার।’ পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে অগ্রগতি কতটা, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রক্রিয়া চলমান আছে। আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করছি এই বছরের শেষের দিকে আমরা দেশবাসীকে একটা সুসংবাদ দিতে পারবো আশা করি।” সংবাদ সম্মেলনে দেশের একমাত্র আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সার্বিক কার্যক্রম তুলে ধরেন সংস্থার প্রধান নির্বাহী ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন।’
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতা হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। এর পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা আলোচনায় আসে। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন, বিএফআইইউ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি তদন্তে নামে। অর্থ পাচারের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমে গতি আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং ১০টি গ্রুপকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত শুরু করে সংস্থাগুলো। গঠন করা হয় ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি। এই ১১টি ঘটনার তদন্তে এখন পর্যন্ত ৯৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে তুলে ধরে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, ‘এসব মামলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন।’
শেখ হাসিনার পরিবারের কত সদস্য রয়েছেন? জবাবে ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘সুর্নিদিষ্ট করে বলা সম্ভব না কতজন হবে। আমরা তো কারো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় দেখে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করি না। অভিযোগ আসলেই তদন্ত করা হয়। এখানে কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে আসলে আমরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করছি না।’ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলা ছাড়াও পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্লট দুর্নীতি মামলায় রায় হয়েছে। প্লট দুর্নীতি মামলায় তিনি ছাড়াও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা ও তার তিন ছেলে-মেয়ে আসামি। বেসরকারি একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠে যুক্তরাজ্যে। দেশটি আড়াই কোটি ডলার সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা আটক করে বাংলাদেশের কাছে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চায়, স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩০৮ কোটি টাকা। যথা সময়ে তথ্য না দেওয়ায় সেই অর্থ আটকাতে পারেনি যুক্তরাজ্য। পরবর্তীতে তা মধ্যপ্রচ্যের একটি দেশে চলে যায় বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে বিএফআইইউ প্রধান কোনো উত্তর দেননি। তবে সংবাদ সম্মেলন শেষে বিএফআইইউর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলে যাওয়া সেই অর্থের একটি অংশ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ শেষে চলতি বছরের শেষ নাগাদ তার একটি অংশ দেশে ফেরত আসতে যাচ্ছে।’
সুইস ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাবে সাড়া নেই : পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ চলে যায় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট জমার পরিমাণ ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার সুইস ফ্রাঁ, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১২,৭৬৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এক বছরের ব্যবধানে জমার পরিমাণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। বিশ্বের ৯০টি দেশের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে। দ্বিপক্ষীয় তথ্য ভাগাভাগি চুক্তি বা স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দেশগুলো সুইজারল্যান্ডে থাকা অর্থ কোন নাগরিকের তা জানতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক এগমন্ট গ্রুপের সদস্য দেশ হওয়ার পর ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাব দেয় বিএফআইইউ। প্রতিবেশি দেশ ভারত এই বিষয়ে চুক্তি করতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি। সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কতটা হল? জবাবে বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনও কোনো আপডেট নাই।’ এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হিসেবে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বিএফআইইউর সমঝোতা স্মারক আছে, বলেন তিনি। তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না থাকায় সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারছে না বিএফআইইউ।
সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আর্থিক খাত থেকে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন পেয়েছে বিএফআইইউ। এর মধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন হচ্ছে ২০ হাজার ৫২৪টি। আর সন্দেহজনক কার্যক্রমে অর্থ ব্যবহারের ঘটনা শনাক্ত হয় ৯ হাজার ৬৭৫টি। তার আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন এসেছে ১৭ হাজার ৩৪৫টি। ১ বছরে সন্দেহজনক কার্যক্রম বেড়েছে ১২ হাজার ৮৫৪টি বা ৭৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিলে দেশের ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে এগিয়ে। গত তিন অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো ২৮ হাজার ৭৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন বিএফআইইউকে দিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ১৫ হাজার ৯৯১টির তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।
অর্থপাচার করার নিত্য নতুন উপায় বেড়ে যাচ্ছে আর্থিক খাতে। অনলাইন জুয়া ও গেমিং একটি অংশ। তা প্রতিরোধে প্রস্তুতি কেমন, জানতে চাইলে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, ‘প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে মানি লন্ডারিংয়ের ধরনটা পালটে গেছে। সুতরাং আমরা এগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রযুক্তিগতভাবে আমরা সক্ষমতা অর্জন করছি।’