
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট একাধিক মন্ত্রী-এমপির পাশাপাশি আসামি হতে পারেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজও। আগামী মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এ মামলায় আনুষ্ঠানিক চার্জ (ফরমাল চার্জ) দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলার অগ্রগতি জানতে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এসেছেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারাসহ ১০-১৫ জনের একটি টিম।
তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে খসড়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে চিফ প্রসিকিউটর এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
বৈঠকে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিস এবং জুবায়ের আহমেদ।
এ ছাড়া তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডিশনাল আইজিপি শহীদুল্লাহ এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
খসড়া প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা, পুলিশ ও বিজিবি প্রধান : মামলার আসামিদের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘খসড়া তালিকায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সেখানে পুলিশ প্রধান, বিজিবি প্রধানসহ এরকম কয়েকজন আমরা মোটা দাগে বলতেই পারি যে তাদের বিরুদ্ধে একটা খসড়া রিপোর্ট এসেছে, সেটা আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব।’
তবে এখনই সব আসামির নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসামিদের তালিকা যেহেতু একটি খসড়া, চূড়ান্ত প্রতিবেদন যেহেতু আমরা রিসিভ করিনি, তালিকাটা আমরা প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। অনেক আসামি আছে, তারা হয়তো এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। নাম প্রকাশ করলে সেই আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অসুবিধা হবে।’
‘সাধারণ আদালতের বদলে ট্রাইব্যুনালে এই বিচার কেন হচ্ছে’- এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এটিকে সুপরিকল্পিত ও সিস্টেমেটিক হত্যা বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘এটা অবশ্যই একটা সিস্টেমেটিক অফেন্স। এটা ওয়াইড স্প্রেড এবং টার্গেটেড কিলিং। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি আছে, লোকাল পারপেট্রেটরদের ইনভলবমেন্ট আছে। পরিকল্পিতভাবে হেফাজতে ইসলাম যখন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই জনগোষ্ঠীকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যে তারা নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করে।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের চূড়ান্ত জায়গা থেকে তাদের কোথাও বসতে দেওয়া হয়নি। এটা শুধু ঢাকায় নয়, নারায়ণগঞ্জে ঘটেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটেছে। রাষ্ট্রের সকল অর্গানকে এটার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। আমি মনে করি, এটি এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত সবচেয়ে উপযুক্ত একটি ঘটনা।’
নিহতের সংখ্যা ও হেফাজতের অবস্থান : নিহতের সংখ্যা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা প্রায় ৬১ জনের একটা তালিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা ৫৮ জনকে ইতোমধ্যে আইডেন্টিফাই (শনাক্ত) করতে পেরেছি।’
এ সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘নিহতদের যে সংখ্যা, এই সংখ্যাটা আসছে আমাদের আলোচনাতেও এবং তদন্তের মধ্য দিয়ে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। আমরা আগাগোড়াই বলছি যে এখানে অনেক মিসিং (নিখোঁজ) আছে, যাদের কোনো হদিসই নাই। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন শাপলার শহীদদের গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। নিহতদের পরিচয় প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ‘এখানে শহীদদের মধ্যে আমাদের স্টুডেন্টদের পোরশনটা (অংশ) কিন্তু খুবই কম।’
সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র, বুয়েটের ছাত্র, ট্রাক ড্রাইভার, শ্রমিক, তৎকালীন প্রায় সবগুলো বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মীরাও এই শহীদদের তালিকার মধ্যে আছেন বলেও দাবি করেন হেফাজতের এই নেতা।
খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন আছে। আমরা আরেকটু পর্যালোচনা করে দুই-একদিনের মধ্যেই কারেকশনের কথাগুলো উনাদেরকে বলব। তবে আমাদের যে এক্সপেক্টেশন (আশা) ছিল, আমাদের যে অভিযোগ ছিল, এই খসড়া রিপোর্ট তার কাছাকাছিই আছে।’
মামলার তদন্তে কোনো চাপ ছিল না জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম বলেন, ‘এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে ঢুকানোর ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো চাপ ছিল না। শুরু থেকে প্রসিকিউশন টিম আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে ছিল। প্রত্যেকটা বিষয়ে উনাদের কনসার্ন নেওয়া হয়।’
পুলিশ হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে নিরপেক্ষতা কতটুকু থাকছে- এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া আছে। আমরা তো বহু পুলিশকে আসামি করেছি। কে পুলিশ, কে পাবলিক- এইভাবে দেখে ইনভেস্টিগেশন হয় না। আমরা অপরাধীকে দেখে ইনভেস্টিগেশন করি।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের এই আশঙ্কা থাকার কোনো কারণ নাই যে পুলিশ হলে পুলিশের পক্ষপাতিত্বের কোনো জায়গা আছে। এই মামলার মধ্যেও দেখবেন যে, বেশি সংখ্যক মানুষ কিন্তু পুলিশই হবে।’
২১ জুলাই ফরমাল চার্জ দাখিল : মামলার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের কোনো আসামি যদি নিরপরাধ হয় তাকে আমরা আনব না। কিন্তু কোনো দোষী আসামি যাতে বাদ না পড়ে যায়, সেজন্যে আমরা এই সতর্কতা অবলম্বন করছি। সেই কারণেই আমরা হেফাজতের নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আলোচনা করলাম, পরামর্শ নিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করছি যে, আগামী ২১ তারিখে আমাদের ট্রাইব্যুনাল খোলার দিনই আমি বাদী হয়ে আমাদের ফরমাল চার্জটা দাখিল করতে চাই।’ এর আগে গত ৮ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, ১৩ বছর আগের ওই ঘটনার তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে।
সেই সময় তিনি বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি শেষে ২১ জুলাই বিচার কাজ শুরু হলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) জমা দেওয়া হবে।
এই মামলায় আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ আরও অনেকের নাম উঠে এসেছে।
এ ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা ও শাহরিয়ার কবীরও এই মামলায় আসামি হচ্ছেন বলে প্রসিকিউশন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের হাতে, আসামি শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন : ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে প্রসিকিউশন। প্রতিবেদনে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ, একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, বেসরকারি টেলিভিশনটির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা এবং সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীরের নামও রয়েছে। সেই সঙ্গে তৎকালীন পুলিশ ও র্যাব প্রধানসহ ডিএমপি কমিশনারকেও এতে আসামি করা হয়েছে।
গতকাল রোববার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনটি হাতে পায় প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্ত সংস্থা এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দিয়েছে। বর্তমানে সেটি পর্যালোচনার কাজ চলছে।
আগামী ২১ জুলাই নির্ধারিত সময়েই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। এছাড়া এ মামলার তদন্তের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে কিছুক্ষণ পর আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করা হবে। চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, তদন্তে এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ৩২ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
এদিকে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের মামলার অগ্রগতি জানতে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এসেছেন দলটির শীর্ষ নেতাসহ ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল। গতকাল রোববার সকালে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদের (মধুপুর পীর সাহেব) নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলটি চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর গভীর রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে শাপলা চত্বর খালি করে। ওই অভিযানে বহু মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত চলছে।
শাপলা চত্বরে কী ঘটেছিল সেদিন : ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ডাকা সমাবেশকে ঘিরে রাজধানীর শাপলা চত্বরে জড়ো হয় লাখো মানুষ। গভীর রাতে আলো বন্ধ করে শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। গুলির শব্দ, আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে সমাবেশস্থল। তখন সেই ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি, রং মেখে শুয়ে থাকাসহ নানা কথা বলা হয় তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে। অভিযোগ রয়েছে, ঘুমন্ত ও ক্লান্ত মাদ্রাসা ছাত্র এবং আলেমদের ওপর কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই আক্রমণ চালানো হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, সেই অভিযানে অনেক প্রাণহানি ঘটেছিল এবং সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে ৬ মে ভোররাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের দুটি গণমাধ্যম দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। যৌথ বাহিনীর সেই অভিযানে ঠিক কতজন নিহত হন, তার সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও সেসময় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছিল। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন তদন্তে উঠে এসেছে, সেই রাতের ভয়াবহ চিত্র। চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, পরিকল্পিত সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। শুধু ঢাকাতেই অন্তত ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও পবিত্র কোরআনের অবমাননার প্রতিবাদসহ ১৩ দফা দাবিতে ওই দিন সমবেত হন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ও আলেমণ্ডওলামারা। এর আগে ২০১৩ সালের শুরুতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের কিছু ব্লগার কর্তৃক ইসলাম ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে রাজপথে নামে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। তৎকালীন আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ১৩ দফা দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। ৬ এপ্রিল ঐতিহাসিক লংমার্চের পর ৫ মে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয় সংগঠনটি। ৫ মে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ ঢাকার প্রবেশপথের বাধা ডিঙিয়ে মতিঝিলে জড়ো হতে থাকেন। দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সংঘর্ষের পর সন্ধ্যায় শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন কয়েক লাখ মানুষ। ওই মুহূর্তে হেফাজতের তৎকালীন মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী মঞ্চে অবস্থান করে আন্দোলনকারীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল : বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই রাতের ভয়াবহতা। ৫ মে রাত সোয়া ১টা। শাপলা চত্বরের মঞ্চে চলছে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের উত্তেজনাকর বক্তব্য। বিদ্যুৎ বন্ধ। সমাবেশ এলাকায় তখন ঘুট ঘুটে অন্ধকার। অন্যদিকে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির শত শত সদস্য প্রস্তুত হয়ে আছেন পল্টনের তোপখানা মোড়, ফকিরাপুল ও দিলকুশা এলাকায়। অবস্থানকারীদের সরে পড়ার জন্য খোলা রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কমলাপুর স্টেশন যাওয়ার রাস্তা এবং বঙ্গভবনের দিকের রাস্তা। রাত দেড়টার দিকে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তোপখানা মোড় থেকে এগোনোর চেষ্টা করেন। তারা প্রথমে হাতমাইক ব্যবহার করে অবস্থানকারীদের সরে যেতে বলেন। কিন্তু মঞ্চ থেকে তখনো আসতে থাকে উত্তেজনাকর বক্তব্য। ঘণ্টাখানেক এভাবে চলে।
রাত পৌনে ৩টার দিকে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা ফাঁকা গুলি আর কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে থাকেন। থেমে থেমে সাউন্ড গ্রেনেডও ব্যবহার করা হয়। শত শত ফাঁকা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ এবং অন্ধকার এলাকায় এসবের আলোর ঝলকানি মুহূর্তেই ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।
১০ মিনিট ধরে চলে এ পরিস্থিতি। এরই মধ্যে একপর্যায়ে মঞ্চের মাইক বন্ধ হয়ে যায়। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ফাঁকা গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে এগোতে শুরু করেন শাপলা চত্বরের দিকে। ট্রাকের ওপরে থাকা ভ্রাম্যমাণ মঞ্চ খালি হয়ে যা মুহূর্তেই। সেখানে মঞ্চের পাশে একটি ভ্যানের ওপর কাফনের কাপড় এবং পলিথিন দিয়ে মোড়ানো চারটি মৃতদেহ ছিল। এগুলো দিনের সংঘর্ষে নিহতদের মৃতদেহ বলে পুলিশ দাবি করে।
অভিযানের সময় হেফাজতের শত শত কর্মী–সমর্থক মতিঝিল এলাকায় সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পুলিশ পুরো এলাকার দখল নেয়ার পর বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নেয়াদের বের করে আনে। হেফাজতের শত শত কর্মী-সমর্থক মাথার ওপর দুই হাত তুলে লাইন ধরে পুলিশের কর্ডনের মধ্য দিয়ে ওই এলাকায় বিভিন্ন ভবন থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। তাদের বেশিরভাগ ছিল মাদ্রাসার ছাত্র ও কিশোর। তাদের চোখে-মুখে ছিল অজানা আতঙ্ক, ভয়।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেকে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার মাদ্রাসা থেকে এসেছিলেন। রাজধানী ঢাকার রাস্তা তাদের অচেনা। কীভাবে ফিরে যাবেন, সেই ধারণাও তাদের ছিল না। পুলিশ তাদের বঙ্গভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে এবং কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। ভোর ৪টার সময়ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের থেমে থেমে ফাঁকা গুলি ছুড়তে দেখা যায়। তারা তল্লাশি চালান আশপাশের ভবনগুলোতে।
ওই ঘটনায় আড়াই হাজারের মতো নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলেছিল বিভিন্ন দল। তবে পুলিশ বলেছিল, অভিযানের সময় আহত একজন পরে হাসপাতালে মারা যান। আর দিনের সহিংসতায় নিহত চারজনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল মঞ্চের কাছে একটি ভ্যানে। ২০১৩ সালের ৫ মে দিনের সহিংসতা এবং পরদিন ৬ মে দুই দিনে সারা দেশে সহিংসতায় ২৮ জনের নিহত হওয়ার কথা বলেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ঘটনার পর থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আসছিলেন ভুক্তভোগীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে হেফাজতে ইসলাম কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেও বিনিময়ে মামলা-হামলার শিকার হতে হয় বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মীদের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, এই মামলার তদন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৩২ জনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।