ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

স্পেন সীমান্তে ৫৭ অভিবাসন প্রত্যাশীর করুণ মৃত্যু

স্পেন সীমান্তে ৫৭ অভিবাসন প্রত্যাশীর করুণ মৃত্যু

একদিনেই বদলে গেছে একটি শহরের জনসংখ্যার হিসাব। মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় স্থল ও সমুদ্রপথে প্রবেশ করেছেন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ।

সীমান্ত পেরোনোর এ নজিরবিহীন চেষ্টায় অন্তত ৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কেউ সাঁতরে যেতে গিয়ে ডুবে মারা গেছেন, আবার কেউ সীমান্তের বাঁধ ও বেড়া অতিক্রমের সময় ভিড়ের চাপে প্রাণ হারিয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে মোট কতজন প্রবেশ করেছেন, তা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংখ্যাটি প্রায় ৫০ হাজার বললেও সেউতার স্থানীয় সরকারের প্রধান হুয়ান হেসুস বিভাসের হিসাবে তা ৬০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। প্রায় ৮৩ হাজার ৬০০ জনসংখ্যার শহরটির জন্য এ ঢল ছিল কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এক মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট।

এ ঢলের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য। জুলাইয়ে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সাঁতরে সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর সময় সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। অনলাইনে বিষয়টি এমনভাবে ছড়ানো হয়, যেন সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছাতে পারলেই স্পেনে থেকে যাওয়া যাবে। বাস্তবে আদালতের রায় তাৎক্ষণিক ফেরত ঠেকালেও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসনের সুযোগ বন্ধ করেনি। গুজবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মরক্কোর তরুণদের অর্থনৈতিক হতাশা। দেশটির ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে। ভালো ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই ইনস্টাগ্রাম ও অন্য প্ল্যাটফর্মে সফলভাবে সীমান্ত পার হওয়ার ভিডিও দেখে সেউতার দিকে রওনা হন। শান্ত সমুদ্রও সাঁতরে পার হওয়ার চেষ্টা বাড়িয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সেউতা সফর করে ঘটনাটিকে দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সীমান্তে সেনা ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খাবার ও আশ্রয়ের অভাবেও অনেকে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা শুরুতেই কেন এত বড় জনস্রোত ঠেকাতে পারলেন না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সীমান্ত শিথিল করার অভিযোগ উঠলেও তার নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি। মরক্কোর প্রতিনিধিরাও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সেউতার ঘটনা তাই অর্থনৈতিক হতাশা, অনলাইন গুজব, আইনের ভুল ব্যাখ্যা এবং দুর্বল প্রস্তুতির সম্মিলিত ফল।

কঠিন সংকটে ইউরোপের দেশগুলো : গণজোয়ারের মুখে স্প্যানিশে ঢুকে পড়া হাজার হাজার আফ্রিকান নাগরিক যাতে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে ঢুকতে না পারে সেজন্য স্পেনের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করা হচ্ছে। সব দেশই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এ নিয়ে ইউরপোরের দেশগুলোর মধ্যে কোন্দলও দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার মরক্কোর উপকূলে অবস্থিত স্প্যানিশ শহর সেউতায় স্থল ও সমুদ্রপথে ৬০ হাজার অভিবাসী ঢুকে পড়ায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্প্যানিশ সেনাদের কঠিন বেগ পেতে হয়। ইইউতে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) এক দিনে অবৈধ অভিবাসীদের সর্বকালের বৃহত্তম এই অনুপ্রবেশের পর কনজারভেটিভ এবং রিফর্ম ইউকে ব্রিটেনের সীমান্ত শক্তিশালী করতে মন্ত্রীদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ব্রিটেনের ছায়া ফরেন সেক্রেটারি প্রীতি প্যাটেল বলেছেন, সীমান্ত অতিক্রমকারীদের মধ্যে অনেকেই অনিবার্যভাবেই যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করবে। রিফর্ম নেতা নাইজেল ফারাজ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হাজার হাজার তরুণ, যাদের অনেকেই বিপজ্জনক, তারা ক্যালে এবং আমাদের দেশের দিকে এগিয়ে আসবে। এখন জেগে ওঠার সময়। এটি আমাদের সভ্যতার লড়াই। অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, পরিস্থিতিটি উদ্বেগের কারণ। তিনি আরও যোগ করেন, কর্মকর্তারা স্প্যানিশ সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন- যাতে সহযোগিতা করা যায় এবং এর পরিণতিগুলো বোঝার জন্য।

প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি লুইস হাই বলেছেন, সেউতার ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে তিনি আরও বলেন, এটি কোনো আক্রমণকারী জাতি বা বাহিনী নয়। এটি বিপুল সংখ্যক মানুষের সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য একটি দেশে প্রবেশের চেষ্টা এবং এ মানুষদের আমাদের দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করা থেকে আমাদের থামাতে হবে। তবে সেউতার এ দৃশ্য ইউরোপজুড়ে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয়েছে। ফিনল্যান্ডের সমর্থনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে ইইউর সীমান্তহীন শেনজেন অঞ্চল থেকে স্থগিত করার দাবি জানান। তিনি একতরফাভাবে স্প্যানিয়ার্ডদের সঙ্গে ইতালির শেনজেন চুক্তি স্থগিত করেন। ইইউ প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, সেউতায় অভিবাসীদের এই ঢল অগ্রহণযোগ্য এবং স্পেনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, আমাদের নিয়ম না মেনে কাউকে আমাদের ইউনিয়নে আসতে দেওয়া যায় না। বিপজ্জনক সীমান্ত পারাপার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা স্পেনের সঙ্গে সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালু করবে। পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের হাত থেকে ইউরোপকে রক্ষা করতে তার দেশ বেলারুশ সীমান্তে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সীমান্ত শক্তিশালী করেছে। তিনি আরও যোগ করেন, শেনজেনকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে স্পেনকে আমাদের উদাহরণ অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পাল্টা জবাবে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালি, গ্রিস এবং পশ্চিম বলকান অঞ্চলের মাধ্যমে বহু সংখ্যক অভিবাসী অবৈধভাবে ইইউ-তে প্রবেশ করেছে। সেউতা থেকে কথা বলার সময় (যেখানে তিনি হট্টগোলের মুখে পড়েন) তিনি গত বৃহস্পতিবারের ঘটনাকে স্পেনের ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, তার সরকার আগত হাজার হাজার অভিবাসীকে মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর জন্য কাজ করছে। স্পেনের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার জন্য মরক্কো নিজেই এ অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে বলে জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। মাদ্রিদের সেন্টার ফর কনটেমপোরারি আরব স্টাডিজের পরিচালক হাইজাম আমিরা ফার্নান্দেজ বলেন, মরক্কো কর্তৃপক্ষের অগোচরে কিংবা তাদের অনুমতি ছাড়া দেশটি থেকে সেউতায় এত বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থানচ্যুতি ঘটা সম্ভব ছিল না। বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ার ফলে এই ঢল নামে। হাজার হাজার যুবক মরক্কো থেকে সাঁতরে এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, আর অন্যরা বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। গত মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর এই ঘটনা ঘটে, যেখানে বলা হয়েছিল যে সেউতা বা মরক্কোয় স্পেনের আরেকটি ভূখণ্ড মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে আটক হওয়া অভিবাসীদের অবিলম্বে ফেরত পাঠানো যাবে না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত