
‘হিমালয়কন্যা’ নেপালের তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। গত বুধবার এ ঘটনার পর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত নিহত বেড়ে ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ সময় বিদেশি পর্যটকসহ আরও সহস্রাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ। নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টকে এই হালনাগাদ মৃত্যুসংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধারকারী দলগুলোর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত আট জেলা থেকে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে চিতওয়ানে সর্বাধিক ১৩২টি, পূর্ব নাওয়ালপরাসিতে ৮২টি, ধাদিংয়ে ৩৩টি, গোর্খায় ৩০টি, রাসুয়ায় ১৭টি, পশ্চিম নাওয়ালপরাসিতে ১৫টি, নুয়াকোটে ২৮টি এবং তানাহুন জেলা থেকে ২২টি লাশ পাওয়া গেছে।
নেপালের ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’-র সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় অধিবাসী, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক মিলিয়ে অন্তত ৮২৬ জন মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বলের (এপিএফ) ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া নিখোঁজদের মধ্যে ৬৪৪ জনই পর্যটক, যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক এবং ১২৭ জন নেপালি ভ্রমণকারী রয়েছেন। নিখোঁজদের সন্ধানে দুর্গম এলাকাগুলোতে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫৫৮ জন। তাদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। প্রথমে কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, ভূমিকম্পের কারণে বন্যা হয়েছে। তবে এখন ধারণা করা হচ্ছে, ভূমিধসের কারণে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় পুরো দেশ ‘স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত’।
কোন দেশের কতজন নিখোঁজ : নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজদের হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ সহস্রাধিক নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে নেপালের সেনাবাহিনীর ৪৪ জন সদস্য ও নেপাল পুলিশের ২৮ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তিব্বতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বৃহস্পতিবার নেপালের পর্যটন কর্মকর্তারা জানান, বুধবারের হড়পা বানের তাণ্ডবে ৫৭০ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৩টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি পর্যটক আছেন। চীনের সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো দেশের কতোজন নাগরিক ও পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন তা রয়টার্স ও বিবিসির তথ্যে বরাতে তুলে ধরা হল।
ভারত: বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে তাদের দেশের অন্তত ২৮৮ জন নাগরিক নিখোঁজ আর তিব্বতে আটকা পড়ে আছেন আরও ২০০ জন। নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। নিখোঁজ ২৮৮ জনের মধ্যে পর্যটকদের পাশাপাশি নেপালে কর্মরত ভারতীয়রাও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র: নেপালে ৬৫ জন মার্কিন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে হিমালয় অঞ্চলের দেশটির পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে।
মালয়েশিয়া: বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাঠমান্ডুর মালয়েশিয়া দূতাবাসের তালিকাভুক্ত অন্তত ৫৫ জন নাগরিকের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পারছেন না। নেপালের পর্যটন বোর্ড নিখোঁজ মালয়েশীয়দের সংখ্যা ৫১ জন বলে জানিয়েছে।
ইউক্রেইন: এই বন্যায় ইউক্রেইনের ৫৩ জন নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নেপাল: নেপালের ৫৩ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়া: নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজ অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সংখ্যা ৩৫ জন।
যুক্তরাজ্য: নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ের পর থেকে ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
কানাডা: নেপালে ২৫ জন কানাডীয় নিখোঁজ রয়েছেন।
দক্ষিণ কোরিয়া: দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালের এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত তাদের ৯ নাগরিক নিখোঁজ এবং আরও ১০ জন আটকা পড়ে আছেন।
সিঙ্গাপুর: নেপালে নিখোঁজ সিঙ্গাপুরের নাগরিকের সংখ্যাও ৯ জন।
জার্মানি: নিখোঁজদের মধ্যে জার্মানির নাগরিক অন্তত আটজন বলে নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে।
রাশিয়া: প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে রাশিয়ার আটজন নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা: নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার পর থেকে ছয় দক্ষিণ আফ্রিকান নিখোঁজ রয়েছেন।
লাটভিয়া: নিখোঁজদের মধ্যে লাটভিয়ার ছয় নাগরিক আছে।
জাপান: জাপানের প্রধানমন্ত্রী এক্স এ এক পোস্টে জানিয়েছেন, নেপালে তাদের দূতাবাসকে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না এমন পাঁচ নাগরিককে খুঁজতে বলা হয়েছে।
এছাড়া বুধবার থেকে নিখোঁজদের মধ্যে বেলারুশ, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েল, ইতালি, কাজাখস্তান, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, ফিলিপিন্স, পর্তুগাল, স্পেন, সার্বিয়া, সুইজারল্যান্ড ও সুইডেনের নাগরিকও রয়েছেন বলে নেপালের পর্যটন বোর্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।
আকস্মিক বন্যা ভিডিওতে দেখা যায়, ঘন বাদামি রংয়ের কাদামাটির প্রবল স্রোত বিস্তীর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়েছে। পানির তোড়ে সেতু ও ঘরবাড়ি ভেঙে মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এলাকা। গিরং সীমান্ত ক্রসিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রবল পানির স্রোত একটি ভবনে আঘাত হানার আগে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসার সঙ্গে আগামী কয়েক দিনে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার আঘাতে নেপালের বিস্তৃত এলাকার বাড়িঘর, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্র তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি তিব্বতের গিরং কাউন্টির একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে ভূমিধস হয়েছে। এতে বহু স্থানীয় মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
এর আগে, প্রাথমিক তথ্য হিসেবে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে অন্তত ৩৮৪ জন ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, ৩ জন মার্কিন ও ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, তাদেরও অন্তত আটজন নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে সীমান্ত এলাকার ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ তীব্র বন্যা দেখা দেয়। পানির প্রবল স্রোতে মুহূর্তের মধ্যেই বেশ কয়েকটি গ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক এবং একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়।
উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এই কঠিন দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে আমরা ভারত এবং চীন- উভয় দেশের কাছেই প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছি।’ এদিকে নেপালের নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, তাই সীমান্তবর্তী ভারতের দুই রাজ্য উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চীনের অংশে নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাথর, কাদামাটি ও পানির এক বিশাল দেয়াল সব ধ্বংস করে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পথচারী ও অধিবাসীরা জীবন বাঁচাতে এদিকওদিক ছুটছেন।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে প্রদর্শিত সময়ের মাত্র ৭ মিনিট আগে সেখানে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইসিআইএমওডি’র প্রতিনিধি চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, লেন্দে খোলা নদীতে বরফ ও পাথরের ধসই এই বন্যার কারণ। সীমান্ত নদীতে বিশাল বাঁধ বা প্রতিবন্ধকতা এখনো আটকে থাকায় উজানে দ্বিতীয় আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে।
এদিকে নদীর পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়ায় পাহাড়ি জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারছে না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গ্রামগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে জানান, নদীর পাশের বসতিগুলো সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং তার নিজের পাঁচজন আত্মীয়ও নিখোঁজ। রাসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার নিম্নাঞ্চলের লোকজনকে জরুরি ভিত্তিতে উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহের ধস : বিপর্যয়ের শুরুতে ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ায় ঘটনাটি ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ওই কম্পনের উৎস ভূমিকম্প নয়; হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া বিশাল ধ্বংসপ্রবাহই কম্পন সৃষ্টি করেছিল। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে ১ হাজার ২০০ মিটারের বেশি নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এরপর বরফ, পাথর ও কাদার প্রবাহ নদীপথ ধরে দ্রুত নিচের জনপদে ছড়িয়ে যায়। কোনো কোনো স্থানে আধঘণ্টার মধ্যে নদীর পানি প্রায় নয় মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে হিমবাহটি ঠিক কী কারণে ভেঙেছে, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ধসে পড়া মাটি-পাথর উজানে নদীর প্রবাহ আটকে সাময়িক বাঁধ তৈরি করে থাকতে পারে। সেই বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে। তাই উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নদীর গতিপথও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হিমালয় অঞ্চলে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধস নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
গবেষকদের হিসাবে, নেপাল গত তিন দশকে তার হিমবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট ধসের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করার আগে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এই মুহূর্তে অবশ্য কারণের চেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে জীবিতদের খুঁজে পাওয়া। কাদায় ডুবে থাকা বাড়িগুলোর ভেতর কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। আর নদীর তীরে, আশ্রয়কেন্দ্রে ও হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা-একটি ফোনকল, একটি নাম কিংবা অন্তত নিশ্চিত কোনো খবরের জন্য।
জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো শুরু : সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে হেলিকপ্টারে করে তাঁবু, খাবারসহ বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব ত্রাণ দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত। নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট এ তথ্য জানিয়েছেন। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ৫ হাজারের বেশি সদস্য অংশ নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁরা ১২৫ জনকে উদ্ধার করেছেন, যাদের মধ্যে ২০ জন বিদেশি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সড়কপথে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুওয়াকোটের বিদুরের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর দপ্তর জানিয়েছে, তিনি সেখানে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করবেন।
নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন, ওই এলাকায় ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে যে কম্পন শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন। এর পরই ধস নেমে ভয়াবহ স্রোত সৃষ্টি হয়। এদিকে তিব্বতের গিয়রংয়ে একটি হ্রদ এখনো আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ওই হ্রদ থেকে নতুন করে পানি বেরিয়ে এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত-নেপাল সীমান্তের ওপরের দিকে অবস্থিত হ্রদটি উদ্ধারকাজেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সিসিটিভি জানিয়েছে।
এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর তীর্থযাত্রায় ছিলেন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে উচ্চ হিমালয়ে অবস্থিত এই স্থানটি পবিত্র। হিন্দুদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত ভগবান শিবের আবাসস্থল। মানসসরোবর হ্রদও বিভিন্ন ধর্মে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। হিমালয়ভিত্তিক একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সাগর পান্ডে জানান, তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৈলাস-মানসসরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া ১৫ জন ভারতীয়-অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
হেলিকপ্টারে করে ওই এলাকা পর্যবেক্ষণের পর তিনি বলেন, সেখানে মানুষের বসতি বা কোনো স্থাপনা প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবকিছু সমতল হয়ে গেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা গাড়িতে থাকা সবাই মারা গিয়ে থাকতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, দুর্যোগের বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নেপাল একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় তাদের সম্পদ সীমিত। এ কারণে তথ্য পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে এবং নেপালকে ৫ লাখ ডলার সহায়তা দিচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, তার সরকার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বন্যাকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত নেপালি জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে জাতিসংঘের বিভিন্ন দল ও অংশীদার সংস্থাগুলো ত্রাণসামগ্রী ও জনবল পাঠাচ্ছে।
ধেয়ে আসছে নতুন বিপর্যয়, সতর্ক করল চীন : তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছে চীন। দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট একটি ‘বাধ হ্রদ’ (ব্যারিয়ার লেক) আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে যেতে পারে। এতে নিচের দিকে ফের আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপালের অভ্যন্তরীণ ‘চোচেন খোলা’ ও ‘পুরেপু স্যাংপো’ নদীর সংযোগস্থলের কাছে এই প্রাকৃতিক হ্রদটি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল এবং সেটি ইতোমধ্যে উপচে পড়ছে।
চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর পানির চাপ দ্রুত বাড়ছে। বিশাল এই পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে বাঁধটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। এতে ভাটির দিকে থাকা নেপালের ভোতে কোশি এবং ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় এক প্রলয়ঙ্কারী জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসবে।
ভৌগোলিক কারণেই দুর্যোগের ঘনঘটা নেপালে! : সিসিটিভি আরও জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় হ্রদটির পানির স্তর ও গতিপ্রকৃতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। এদিকে নতুন এই দুর্যোগের পূর্বাভাস পেয়ে নেপালের সিন্ধুপালচক এবং রাসুয়া জেলা প্রশাসন নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। সীমান্ত এলাকায় নেপালের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীএবং সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর হিমবাহবিদ এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ৭২ ঘণ্টা তাই দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয় অঞ্চলের খাড়া ভূপ্রকৃতি, ভারী বৃষ্টিপাত, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং ভূমিধস- সবকিছু মিলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তারা সতর্ক করেছেন, একটি বাধ হ্রদ হঠাৎ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে ধেয়ে যেতে পারে। এতে নদীর তীরবর্তী বসতি, সেতু, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রসঙ্গত, এই সতর্কবার্তা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তিব্বত ও নেপালের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে এরই মধ্যে প্রাণহানি বেড়ে ২৮৯ জনে দাড়িয়েছে। এছাড়াও বন্যা ও কাদার স্রোতে ভেসে গিয়ে দেশটিতে এখনও ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বত অংশেও ৩ জনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশ মিলিয়ে নিখোঁজের মোট সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে চীন ও নেপাল উভয় দেশই উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, অব্যাহত বৃষ্টি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলছে।