
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। প্রথম দিনের বৈঠকে সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকারসহ সাবেক ১২ জন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। নেপালে আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির ঘটনাতেও শোক জানিয়েছে সংসদ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকের শুরুতে চলতি অধিবেশনের জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার। শোকপ্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণের পর প্রয়াতদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
জমির উদ্দিন সরকার ছাড়াও যেসব সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক জানানো হয় তারা হলেন বিএনপির মো. রুস্তম আলী মোল্লা, জামায়াতে ইসলামীর ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, বিএনপির সাবেক চিফ হুইপ ও প্রতিমন্ত্রী হারুন আল রশীদ, জাসদের মোশারফ হোসেন মিয়া, আওয়ামী লীগের সেলিমা আহমাদ, শরফউদ্দিন খসরু, আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম চৌধুরী, ইসলামী ঐক্যজোটের গোলাম সরোয়ার হিরু, আওয়ামী লীগের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায় এবং সাবেক মন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরী। একুশে পদক পাওয়া কবি আল মুজাহিদী ও চিত্রশিল্পী মুস্তফা মনোয়ার, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, লেখক ও শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং শিক্ষাবিদ মকবুল হোসেনের মৃত্যুতেও সংসদে শোক প্রকাশ করা হয়। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতেও শোক জানায় সংসদ। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।
শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করে স্পিকার বলেন, ‘আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, আমরা ইতোমধ্যে, ২০২৬ সালের ১২ জুলাই সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে হারিয়েছি। তার মৃত্যুতে মহান জাতীয় সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছে।’
শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০২৬ সালের ১২ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে মারা যান। তার বাবা ছিলেন মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। স্ত্রী বেগম নুর আখতার সরকারও প্রয়াত। জমির উদ্দিন সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ ও এলএলবি করেন। পরে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-এট-ল’ সনদ পান। ১৯৬০ সালের ২৭ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাই কোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন তিনি। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পান। শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, জমির উদ্দিন সরকার জাগদলের কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০২ সালের ২২ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন।
জমির উদ্দিন সরকার ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালের অক্টোবরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৫৯তম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন বা সিপিএ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। ২০০৪ সালে মেক্সিকোতে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন বা আইপিইউ সম্মেলন এবং কানাডায় সিপিএ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জমির উদ্দিন সরকার। পঞ্চগড়ের উন্নয়নে জমির উদ্দিন সরকারের ভূমিকার কথাও শোকপ্রস্তাবে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, তিনি পঞ্চগড়ের ‘মরহুম মৌলভী আজিজ বক্স এতিমখানা’, ‘বেগম নূর আখতার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট’, ‘বেগম খালেদা জিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ এবং ‘ভজনপুর ডিগ্রি কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের ‘ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার উচ্চ বিদ্যালয়’ এবং পঞ্চগড়ের ভজনপুরে ‘বেগম ফখরুন্নেছা আলিম মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। জমির উদ্দিন সরকার এক মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। তার ছেলে ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, “বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার এর মৃত্যুতে জাতি এক অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও আইনজ্ঞকে হারালো এবং তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হল।” এতে বলা হয়, “সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবককে হারাল। এ সংসদ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ, বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করছে।”
শোকপ্রস্তাবের একটি অনুলিপি তার পরিবারের কাছে পাঠানো হবে।