ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ডেঙ্গু ও হামের থাবায় স্বাস্থ্য খাতে চরম বিপর্যয়

ডেঙ্গু ও হামের থাবায় স্বাস্থ্য খাতে চরম বিপর্যয়

সরকারি হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসেই হাম ও ডেঙ্গুতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩ হাজার ৮২৯ জনের বেশি মানুষ, আর প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮২ জন। হাসপাতালগুলোতে শয্যার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, আর এর মধ্যেই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

একদিকে প্রতিরোধযোগ্য রোগ হামের প্রকোপে শিশুদের মৃত্যু, অন্যদিকে ডেঙ্গুর থাবায় কর্মক্ষম মানুষের আকস্মিক প্রাণহানি। মশা আর ভাইরাসের এই জোড়া ধাক্কায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রীতিমতো ধুঁকছে। সরকারি হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসেই হাম ও ডেঙ্গুতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩ হাজার ৮২৯ জনের বেশি মানুষ, আর প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮২ জন। হাসপাতালগুলোতে শয্যার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, আর এর মধ্যেই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

হামের ভয়াবহতা (মার্চ-আগস্ট) : গত পাঁচ মাসে মোট আক্রান্ত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৯৭৯ জনের। এর মধ্যে শুধু আগস্টেই মারা গেছে ১৩৯ শিশু (জুলাইয়ে ছিল ১১৯)। আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ১,০৭৪ জন আক্রান্ত হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১,২৩১ জন আক্রান্ত ও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ (চলতি বছর) : এ বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ৩৭,১৭০ জন এবং মৃত্যু ১০২। শুধু আগস্ট মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২০,৫৩৬ জন, যা জুলাইয়ের (৯,২০৬ জন) দ্বিগুণেরও বেশি। আগস্টে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪৩ জন। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১,৩২৪ এবং মৃত্যু ৫।

মাঠপর্যায়ের চিত্র: পথে বসছে পরিবার : পরিসংখ্যানের বাইরের বাস্তবতা আরও করুণ। হামে সবচেয়ে বেশি কাবু হচ্ছে শিশুরা, আর ডেঙ্গু কেড়ে নিচ্ছে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে।

হামের শিকার : ঢাকার গাজীপুরের ছয় বছরের শিশু রবিউল হোসেন। টানা এক সপ্তাহ জ্বরে ভোগার পর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। চিকিৎসার খরচ জোগাতে রিকশাচালক বাবা সরোয়ার হোসেন এরই মধ্যে নিজের রিকশাটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

ডেঙ্গুর শিকার : বরিশালের বাদল রহমান (৩৮)। দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে মারা যান তিনি। ছয় সদস্যের পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী রেশমা আক্তার (২৭) তিন ও পাঁচ বছরের দুই শিশু নিয়ে এখন আত্মীয়স্বজনের অনুদানে কোনোমতে টিকে আছেন।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও কর্তৃপক্ষের 'গবেষণা' জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে একদম তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। টিকা ও প্রচারণার অভাবে এটি সর্বসময় সঞ্চারণশীল রোগে পরিণত হতে যাচ্ছে।

আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনের মতে, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সারা বছর না চালালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সামনে আরও বাড়বে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার দাবি করেছেন, এক মাসের মধ্যে হামের টিকার কাভারেজ লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পূরণ হয়েছে। এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'এই শিশুরা হামে নাকি অন্য কোনো কারণে মারা যাচ্ছে, তা দেখতে গবেষণা চলছে। মা ও শিশুর অপুষ্টির পাশাপাশি দেরি করে চিকিৎসাকেন্দ্রে আসার প্রবণতায়ও মৃত্যু বাড়ছে।'

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর প্রাণ গেল

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর প্রাণহানি হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ৩৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং ৬৩ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামসংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনই ঢাকা বিভাগের, বাকি একজন ময়মনসিংহ বিভাগের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৯ জন। সবমিলিয়ে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৮৩ শিশু মারা গেল।

হামের উপসর্গের রোগী ১ লাখ ৬০ হাজার ছাড়াল : দেশে সরকারি হিসাবে হামের উপসর্গের রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৪৪৭ জনে। হাম সংক্রান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবারের বুলেটিনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে অনেকেই হাসপাতালে যান। তবে সবার নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় হামের বিস্তৃতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে সরকারি হিসাবের উপরই পরিসংখ্যানের জন্য ভরসা করতে হচ্ছে। এদিকে দেশে গত একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ জনেরও মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময়ে নতুন ৬৩ জন হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

বুলেটিনে বলা হয়, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৩ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১ জন মারা গেছে।

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৯৮৩ জন। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে ৯৯ জন ও উপসগ নিয়ে ৮৮৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৯৮ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ; সেখানে মারা গেছে ১৫১ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯২, চট্টগ্রামে ৬৪, বরিশালে ৫৬, ময়মনসিংহে ৭৫, খুলনায় ৩৪ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৩৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৯৫৩ জন। ঢাকা বিভাগে ভর্তি ৩০৪ জন, রাজশাহীতে ২৪, সিলেটে ১২১, চট্টগ্রামে ২৬৩, বরিশালে ১০৩, ময়মনসিংহে ৫, খুলনায় ৬৬, রংপুরে ১৭ জন। এ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৭২ জন; তাদের মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৭ জন হাসপাতাল ছেড়েছে।

এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১০০ ছাড়াল : এক দিনে আরও ৫ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা একশ ছাড়াল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১,৩২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দুজন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম বিভাগ ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত