
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় ও জনবান্ধব করতে নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা এবং বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট শর্তে পেনশন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে পুরো অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, মানুষের আগ্রহ বাড়াতে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব সভায় উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন সুবিধাগুলো চালু হতে পারে।
বর্তমান নিয়মে পেনশনার ৬০ বছর বয়সে মাসিক পেনশন পাওয়া শুরু করেন। পেনশন পাওয়ার সময় তার মৃত্যু হলে নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত একই হারে মাসিক পেনশন পান।
নতুন প্রস্তাবে নমিনির পরিবর্তে পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাবও আলোচনায় আসতে পারে।
সর্বজনীন পেনশন আইনে গ্রাহকের জমা অর্থের একটি অংশ বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এতদিন এ সুবিধা চালু হয়নি।
এবার সেই সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট প্রয়োজনে গ্রাহক তার জমা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন। ঋণের বিপরীতে পাওয়া সুদও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পেনশন হিসাবে জমা হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন প্রস্তাবে পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর কেউ শারীরিক ও আর্থিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে বিশেষ বিবেচনায় পেনশন ব্যবস্থা থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক পুরো জমা অর্থ তুলে নিতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা কমাতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পেনশনারদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে সরকার। এ বিষয়ে একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ১০ থেকে ২০ টাকা প্রিমিয়াম নেওয়া হতে পারে। এর মাধ্যমে পেনশনারদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করে সরকার। বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টেকসই সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে প্রায় তিন বছর পরও এতে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। বর্তমানে চারটি স্কিমে মোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের জমার পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য চালু করা 'সমতা' স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রবাসীদের জন্য চালু করা 'প্রবাস' স্কিমে অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী এতে নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী ৯৭ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। পর্ষদের সভায় প্রস্তাবগুলো অনুমোদন হলে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। এরপর নতুন সুবিধাগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।