ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ

প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মেধাপাচারের পরিবর্তে 'মেধার আবর্তন' গড়ে তুলে দেশের প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সিলিকন ভ্যালিসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত বৃহস্পতিবার বলেন, 'আমরা ব্রেন ড্রেইনের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে যেতে চাই। আমরা ব্রেন সার্কুলেশন চাই। আমরা তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চাই।' তিনি বলেন, বিদেশে থাকা উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন বাংলাদেশি পেশাজীবীদের বিনিয়োগ, গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় সরকার।

যুক্তরাষ্ট্র সফরে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শামা বলেন, সিলিকন ভ্যালি থেকে কয়েকজন বাংলাদেশি পেশাজীবী ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন। অন্যরাও স্থায়ীভাবে দেশে না ফিরেও বিনিয়োগ, যৌথ গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে অবদান রাখতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে এআই, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প ও ডিজিটাল অবকাঠামোর বিকাশ। প্রচলিত শিল্পের বাইরে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতেও এসব খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশকে এআই, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব জোরদারে এআই-চালিত ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা ও এআই খাতে ২ লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট তৈরিতে আরও ৮ লাখ কর্মসংস্থান অন্তর্ভুক্ত। ইশতেহারে এআই-চালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস, বৈশ্বিক এজ ডেটা সেন্টার হাব এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপের জন্য প্রণোদনার কথাও বলা হয়েছে। 'আমাদের সম্ভাবনা আছে, মেধা আছে, মানুষ আছে,' বলেন শামা। প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে বড় সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সম্ভাবনা : উচ্চমূল্যের রপ্তানি ও দক্ষ কর্মসংস্থানের নতুন উৎস হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদারের সময়েই সিলিকন ভ্যালিতে এসব আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেমিকন্ডাক্টর খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করেন। তৈরি পোশাকশিল্পের পর এ খাতকে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকস, এআই অ্যান্ড রোবোটিকস (বিয়ার) সামিট ২০২৬-এ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ প্রণোদনা, বিশেষায়িত অবকাঠামো, গবেষণা অংশীদারিত্ব এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সেবা রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, 'সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে আমাদের সম্ভাবনা রয়েছে। ডেটা সংরক্ষণ ও ডেটা অবকাঠামো নিয়ে আমরা কাজ করতে যাচ্ছি।'

বাংলাদেশের উপযোগী সার্বভৌম এআই : বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার উপযোগী 'সার্বভৌম এআই' গড়ে তোলার বিষয়েও সরকারের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে কৃষি, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। শামা বলেন, 'বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কী ধরনের এআই প্রয়োজন, সেটিই মূল প্রশ্ন।' তিনি বলেন, 'একজন কৃষক কীভাবে কৃষিকাজে এআই ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারেন? আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলো কীভাবে এ প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারে?' তার মতে, এআইয়ের ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, ক্ষুদ্র ব্যবসাকে শক্তিশালী করতে এবং নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

এ উদ্যোগ সরকারের প্রস্তাবিত মানবকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ নীতিতে দায়িত্বশীল উদ্ভাবন, তথ্য সুরক্ষা, নৈতিক ব্যবস্থাপনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত জুলাইয়ে সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্সে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রস্তাবিত নীতির রূপরেখা তুলে ধরেন। শামা বলেন, ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে বাংলাদেশের মানুষ উদীয়মান প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও উৎপাদনশিল্পে অংশীদারিত্ব : যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গেও গবেষণা, উদ্ভাবন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে বৈঠক করে।

শামা বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় দুটির সঙ্গে আমাদের বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।' উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের অংশীদারিত্ব গবেষক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করার পাশাপাশি বৈশ্বিক উদ্ভাবন নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও বাংলাদেশকে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র হতে পারে।' অ্যাপলের বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের উদাহরণ তুলে ধরে শামা বলেন, যথাযথ নীতি, অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও এ ধরনের উৎপাদন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব। 'বাংলাদেশ কেন নয়? এটি অবশ্যই সম্ভব,' বলেন তিনি।

বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর গুরুত্ব : এসব লক্ষ্য অর্জনে স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন শামা। তিনি বলেন, বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী কাজ করছেন। বিএনপি সরকারের বৃহত্তর প্রযুক্তি কর্মসূচিতে স্টার্টআপ অর্থায়ন, উদ্ভাবনে প্রণোদনা, ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

শামা বলেন, 'আমরা যদি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে সম্ভাবনা অনেক বিস্তৃত হবে।' তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রবাসী মেধা, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

শামা বলেন, সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু মেধাপাচার ঠেকানো নয়; বরং বাংলাদেশ ও বিশ্বের উদ্ভাবনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে মেধা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও জ্ঞানের টেকসই দ্বিমুখী বিনিময়ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাঁর মতে, 'ব্রেন সার্কুলেশন' বা মেধার এই দ্বিমুখী প্রবাহ দেশের জনমিতিক সম্ভাবনাকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত