
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে। ঢাকার সড়কেও ফুল ট্যাংক অকটেনের আশায় বাইকচালকদের হাহাকার করতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকেও হাঁটতে হয় কৃচ্ছ্রসাধনের পথে। তবুও দেশটির জ্বালানি সংক্রান্ত কিছু ভালো উদ্যোগ বিশ্বমিডিয়ার নজর কাড়ে। সরবরাহ সংকট ও ক্রমবর্ধমান মূল্যের মধ্যে স্বস্তি এনে দিয়েছে পাকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাফল্য। চলমান সংকটে সৌরবিদ্যুৎ- কেই ‘বাজির ঘোড়া’ হিসেবে বেছে নিয়েছে ইসলামাবাদ। গত বুধবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
গত মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৮ সাল থেকে পাকিস্তানে চালু হওয়া সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গত ৮ বছরে দেশটির তেল-গ্যাস আমদানিতে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয় করেছে। চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আরও ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতে পারে বলে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামাবাদভিত্তিক রিনিউয়েবলস ফার্স্ট ও ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিভিত্তিক দ্য সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে। গত ৩ এপ্রিল লাহোরের দোকানমালিক আফতাব আহমেদ (৪৯) বার্তা সংস্থাটিকে বলেন, ‘তেল-গ্যাস এখন সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। দাম এত বেড়েছে যে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে মোটরসাইকেল বা গাড়ির জ্বালানি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানির উচ্চমূল্য বিদ্যুৎ বিলকেও প্রভাবিত করছে। সব মিলিয়ে খরচ অনেক বেড়েছে।’
তার মতে, ‘যদি আমরা সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকি, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও সাশ্রয় হবে।’ সম্প্রতি ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম যথাক্রমে ৪২ দশমিক সাত শতাংশ ও ৫৪ দশমিক নয় শতাংশ বাড়িয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সড়কে নেমে ক্ষোভ করে। তেলের পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পরবর্তীতে এক মাসের জন্য সরকারি পরিবহনের ভাড়া মওকুফ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয় সরকার।
পাকিস্তানের প্রায় সব অঞ্চলেই বাসাবাড়ির ছাদে সৌরপ্যানেল দেখা যায়। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কোনো কারণে বিঘ্নিত হলে কার্যকর বিকল্প উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ কাজ করে। বিশেষত, যখন তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, তখন এটি বেশি কার্যকারিতা দেখায়। রিনিউয়েবলস ফার্স্ট-এর জ্বালানি বিশ্লেষক নাবিয়া ইমরান সংবাদ সংস্থাটিকে জানান, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তা পূরণে সৌরবিদ্যুৎ অগ্রগামী ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, ‘গত বেশ কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানিদের কাছে সৌরবিদ্যুৎ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালী সংকটের প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে।’ ‘সৌর প্রযুক্তিকে আঁকড়ে না ধরলে আমাদের জ্বালানি পরিস্থিতি আরও অনেক খারাপ হতো,’ বলে মনে করেন তিনি।
তবে পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়তে থাকলেও এটি চলতি পরিস্থিতির পরিপূর্ণ সমাধান এনে দিতে পারেনি। সরকার জ্বালানি সাশ্রয় করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
গত মাসে সরকারি অফিসে সাপ্তাহিক কর্মদিবস কমিয়ে চার দিন করা হয়। পাশাপাশি, স্কুলগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সোলার প্যানেলের কারণে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থা। এতে জাতীয় গ্রিড ও আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মূলত নানান কারণে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সৌর প্রযুক্তি।’ ক্রেতারাই নতুন এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছেন বলেও মত দেন গবেষকরা। পশ্চিমের দেশগুলোয় চীনের সৌর প্রযুক্তির ওপর বড় আকারে শুল্ক আরোপ করা হলেও সে পথে হাঁটেনি পাকিস্তান। ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিনা শুল্কে চীন থেকে এই প্রযুক্তি আমদানি করেছেন পাকিস্তানিরা। ফলে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০১৮ সালের ১ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে এ বছরের শুরুতে ৫১ গিগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পরও পাকিস্তানিরা জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাকিস্তানে তেল-গ্যাস আমদানি ৪০ শতাংশ কমেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব মতে, পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগ পান না। রিনিউয়েবলস ফার্স্ট-এর নাবিয়া ইমরানের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অনেক দেশের চোখ খুলে দিয়েছে। সবাই অনুধাবন করছে, জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে টেকসই জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ অর্থ বছরে পাকিস্তানের জিডিপির ১১ শতাংশ খরচ হয় তেল, কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে। ‘পাকিস্তানের মতো দারিদ্র্যপীড়িত দেশের জন্য এটা অনেক বড় অংকের অর্থ। এটা দেশটির অন্যান্য উন্নয়ন খাতে খরচ করা যেতে পারতো,’ যোগ করেন তিনি। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার কমিয়ে সৌর ব্যাটারির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে, বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে পরিবহন খাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে ইলেকট্রিক গাড়ির প্রচলনসহ অন্যান্য উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিতে হবে।