ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ট্রাম্প কেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন

সিএনএনের বিশ্লেষণ
ট্রাম্প কেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার বিকালে হোয়াইট হাউসে তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে তাদের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল- ইরানের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?

ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতির সময়সীমা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৮টায় শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য গত মঙ্গলবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল। সে জন্য তার বিমান ‘এয়ারফোর্স টু’ বিমানঘাঁটি অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে প্রস্তুতও ছিল। তবে মার্কিন প্রশাসন বড় এক সমস্যার মুখে পড়েছে। সেটি হচ্ছে, ইরানিদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তার মতে, পরবর্তী আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরানকে চুক্তির খসড়া পাঠিয়েছিল, যেখানে তারা ইরানিদের আগাম সম্মতি চেয়েছিল। কিন্তু বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও কোনো জবাব না আসায় সন্দেহ তৈরি হয়, সশরীর আলোচনার জন্য পাকিস্তানে গিয়ে ভ্যান্স আদৌ কতটা সফল হবেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, মোজতবা খামেনির আড়ালে থাকার প্রবণতা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

গত মঙ্গলবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন, তখনো ইরানিদের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে অনুরোধ করেছিলেন, যেন ভ্যান্স উড়োজাহাজে ওঠার আগে অন্তত একটি জবাব নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও কোনো উত্তর আসেনি। তিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের শীর্ষ সহযোগীরা মনে করছেন, জবাব না আসার প্রধান কারণ হচ্ছে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে ‘কোন্দল’। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে তারা এমনটা ভাবছেন। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং তাদের বর্তমান মজুত নিয়ে আলোচনার টেবিলে আলোচকদের কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ইরানের নেতারা একমত হতে পারছেন না। শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হোয়াইট হাউসে এনসিএএ কলেজিয়েট ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস ডের অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাত নেড়ে বিদায় নেন। ট্রাম্প প্রশাসন আরও মনে করছে, এই জটিলতার অন্যতম কারণ হলো ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি তার অধীনদের স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেন কি না, নাকি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে তারা কেবল আন্দাজে কাজ করার চেষ্টা করছেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, মোজতবা খামেনির আড়ালে থাকার প্রবণতা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এত বাধা সত্ত্বেও এক কর্মকর্তা জানালেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি আলোচকদের শিগগিরই দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেটা কবে বা আদৌ হবে কি না, তা অনিশ্চিত। সামরিক হামলা আবার শুরু করার বদলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ কত দিন, সেটা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরান সরকারকে ‘গুরুতরভাবে বিভক্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এই যুদ্ধের একটি কূটনৈতিক সমাধান চান। তিনি আবার এমন কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে আগ্রহী নন, যা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় নয়। বিশেষ করে যখন তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এরইমধ্যে এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত- এমন কোনো সংকেত পেলেই দ্রুত সফরের ব্যবস্থা করা যাবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান- উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আলোচনার এই সাময়িক ব্যর্থতা ট্রাম্পের জন্য নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ, তিনি এমন একটি চুক্তি করতে চান, যাতে তার সব শর্ত পূরণ হবে।

ইরান প্রকাশ্যে দাবি করেছে, তেহরান নতুন করে আলোচনায় বসার আগে ট্রাম্পকে ইরানি বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। ট্রাম্প এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। মঙ্গলবার সকালে সিএনবিসিকে তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা প্রণালি খুলে দেব না।’ বিকালের বৈঠকে ট্রাম্প ও তার দল যুদ্ধবিরতির সময় বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মতে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই সময় শেষ হওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্প অবশ্য এর আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে ইরান খামেনির সম্মতিতে একটি একক সিদ্ধান্তে আসতে আরও সময় পাবে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মঙ্গলবার একদিকে ইরানকে আলোচনায় রাজি করানোর চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির সময় বৃদ্ধি করতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। সময় শেষ হয়ে আসার মুহূর্তে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেন, ‘ইরানের প্রস্তাব জমা না দেওয়া এবং আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চলবে।’ তবে ইরানি কর্মকর্তাদের কণ্ঠে কোনো পরিবর্তনের সুর শোনা যায়নি।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদী বলেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির সময় বৃদ্ধি করার কোনো অর্থ নেই। গালিবফ ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন। তার মতে, পরাজিত পক্ষ শর্ত আরোপ করতে পারে না। অবরোধ অব্যাহত রাখা আর বোমা হামলা চালানো একই কথা। এর জবাব সামরিকভাবেই দেওয়া উচিত। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির সময় বৃদ্ধির ঘোষণা এমন এক দিনে এলো, যে দিনটি ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। দিনের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, তিনি শিগগিরই ইরানে আবার বোমা হামলা শুরু করতে পারেন। তবে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে ইরান আলোচনার সময়ক্ষেপণ করতে পারে। আলোচকরা আশা করেছিলেন, এই সপ্তাহে অন্ততপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হবে, যা পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে বিস্তারিত আলোচনার পথ খুলে দেবে। তবে এই পদ্ধতির বিরোধীরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান হয়তো আলোচনার নাম করে সময় নিচ্ছে, যাতে যুদ্ধের সময় লুকিয়ে রাখা তাদের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থাগুলো আবার সচল করা যায়।

কয়েক ঘণ্টা পর যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে কলেজ অ্যাথলেটদের সম্মাননা দিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প এই যুদ্ধ নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে চুপ ছিলেন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা, মজুত করা ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং কোন কোন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে- এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত