ঢাকা সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নতুন অস্ত্র ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’ ব্যবহার শুরু হিজবুল্লাহর

নতুন অস্ত্র ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’ ব্যবহার শুরু হিজবুল্লাহর

দক্ষিণ লেবাননের বিধ্বস্ত ভবনের ছাদ আর ধুলার পথ পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল বিস্ফোরকভর্তি একটি কোয়াডকপ্টার (চার পাখার ছোট ড্রোন)। এই ড্রোনটি এতটাই নিখুঁতভাবে চলছিল যে, এর চালক (অপারেটর) নিজের চোখেই যেন লক্ষ্যবস্তুর স্পষ্ট ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। লক্ষ্যবস্তুটি ছিল একটি ইসরায়েলি ট্যাংক, যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েকজন সেনাসদস্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি ফাইবার অপ্টিক ড্রোন। হিজবুল্লাহ ইদানীং এই ড্রোন ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে। এই ড্রোনগুলো থামানো তো দূরের কথা, রাডারে শনাক্ত করাও কঠিন। কারণ, এগুলো কোনো সিগন্যাল বা তরঙ্গ ছড়ায় না, যা জ্যাম বা বিকল করা যায়। অথচ এটি চালককে লক্ষ্যবস্তুর হাই-রেজ্যুলেশনের স্পষ্ট ছবি পাঠাতে পারে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়েহোশুয়া কালিস্কি বলেন, ‘এগুলো সিগন্যাল জ্যামিংয়ের শিকার হয় না। এর কোনো ইলেকট্রনিক তরঙ্গ না থাকায়, এটি ঠিক কোথা থেকে ছোড়া হয়েছে, তা-ও খুঁজে বের করা অসম্ভব।’

গতকাল রোববার হিজবুল্লাহর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক কেজি ওজনের এই ড্রোনটি তার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। অথচ ইসরায়েলি সেনারা টেরই পায়নি যে এমন কিছু ধেয়ে আসছে! ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তথ্যমতে, ওই হামলায় ১৯ বছর বয়সি সার্জেন্ট ইদান ফুকস নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন।

এরপর আহতদের উদ্ধারে আসা একটি হেলিকপ্টার লক্ষ্য করেও আরও ড্রোন ছোড়ে হিজবুল্লাহ। এই ড্রোনগুলোর মূল শক্তি হলো এদের সরল নির্মাণপদ্ধতি। সাধারণ ড্রোনে তারবিহীন সিগন্যাল দিয়ে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু ফাইবার অপ্টিক ড্রোনে একটি সরু তারের (ফাইবার অপ্টিক কেবল) মাধ্যমে ড্রোনটিকে সরাসরি এর চালকের সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক সূত্র সিএনএনকে জানায়, ফাইবার অপটিক কেবল এতটাই সরু ও হালকা যে এটি খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য। এই তারটি ১৫ কিলোমিটার বা তারও বেশি লম্বা হতে পারে। ফলে চালক নিরাপদ দূরত্বে বসে ড্রোনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুর একদম স্বচ্ছ ছবি দেখতে পান। ড্রোন হামলা ঠেকাতে আইডিএফ সাধারণত নিজেদের প্রযুক্তিগত সুবিধার ওপরই নির্ভর করে। তারা ড্রোনের সিগন্যাল বা ফ্রিকোয়েন্সি জ্যাম করে দেয়। কিন্তু ফাইবার অপ্টিক ড্রোনে কোনো সিগন্যাল না থাকায় আইডিএফ ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে এটি থামাতে পারে না। এমনকি এটি যে ধেয়ে আসছে, তা শনাক্ত করাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি সামরিক সূত্র জানায়, ‘জালের মতো কোনো ভৌত প্রতিবন্ধকতা (ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার) ছাড়া এটি ঠেকাতে আর তেমন কিছুই করার নেই।’

যুদ্ধক্ষেত্রে ফাইবার অপ্টিক ড্রোন প্রথম ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে দেখা যায় ইউক্রেনে। সেখানে রুশ বাহিনী এগুলো ব্যবহার করে দারুণ সফল হয়েছিল। তারা এই ড্রোনের তারকে একটি বেস ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করত এবং পরে সেই বেস ইউনিট যুক্ত হতো চালকের সঙ্গে। এই বাড়তি সংযোগের কারণে চালক ড্রোন থেকে অনেক দূরে নিরাপদে থাকতে পারতেন। হিজবুল্লাহর ড্রোন চালকরা দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের নিশানা করছেন।

সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির গবেষক স্যামুয়েল বেন্ডেট বলেন, ‘এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি সিস্টেম। কোনো অভিজ্ঞ চালক যদি এমন বাহিনীর ওপর এটি ব্যবহার করেন, যারা ড্রোন হামলার জন্য প্রস্তুত নয়, তবে তা মারাত্মক হতে পারে। এমনকি যারা সতর্ক আছে, তাদের জন্যও এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত