
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর নতুন তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে ভোক্তা মূল্য সূচক মাসিক ভিত্তিতে ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবেই মূল্যস্ফীতির এই উল্লম্ফন ঘটেছে। মাসিক মূল্যবৃদ্ধির মোট অংশের ৬০ শতাংশই এসেছে জ্বালানি খাত থেকে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির গতি আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কমেছে। মে মাসে সামগ্রিক খাদ্যদ্রব্যের দাম ০.২ শতাংশ এবং মুদি পণ্যের দাম ০.১ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিল মাসে এই হার ছিল যথাক্রমে ০.৫ শতাংশ ও ০.৭ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসও ছিল মে মাসে মাসিক মূল্যস্ফীতি ০.৫ শতাংশ হবে ও বার্ষিক হার এপ্রিলের ৩.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.২ শতাংশে পৌঁছাবে। ফ্যাক্টসেট -এর জরিপে এমনই ধারণা উঠে এসেছিল। লয়োলা মেরিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও অর্থ বিভাগের অধ্যাপক সাং ওন সন এক বিশ্লেষণে বলেন, ৪.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যবৃদ্ধি মূলত জ্বালানি খাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, বিশেষ করে পেট্রোলে। এটি এখন পুরো অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।
অন্যদিকে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে হিসাব করা ‘কোর সিপিআই’ তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে। এপ্রিলের তুলনায় এটি ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বার্ষিক কোর মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ২.৯ শতাংশ।
মে মাসের এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতির ওপরও নতুন করে নজর পড়েছে। তবে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প মূল্যস্ফীতির এই তথ্যকে গুরুত্বহীন বলে দেখানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, সংখ্যাগুলো দারুণ ছিল। আমি এটা পছন্দ করি। আমি মূল্যস্ফীতিকেও ভালোবাসি। ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে তেল পরিবহন শুরু হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে।
যুদ্ধ-পরবর্তী মূল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা কমছে। পাথরের মতো দ্রুত নিচে নেমে আসবে। ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি প্রথম মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং শ্রমবাজারও এখনও শক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে সুদের হার বাড়ানোর কথাও বিবেচনা করতে পারে। যদিও মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা কম, তবুও গত তিন মাসে মূল্যস্ফীতির যে গতি দেখা গেছে, তা ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ের পর সবচেয়ে দ্রুত। ওই সময় মূল্যস্ফীতি ৪১ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ২০২২ সালের মতো গুরুতর হবে না। সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরে মূল্যস্ফীতি ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। ২০২২ সালে এটি ৯.১ শতাংশে উঠেছিল। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ ন্যান্সি ভ্যান হাউটেন বলেন, মূল্যস্ফীতি হয়তো আরও খারাপ হবে না। তবে কিছু সময়ের জন্য এটি উষ্ণ অবস্থায় থাকবে। আগামী বছর পর্যন্ত এটি পুরোপুরি শীতল নাও হতে পারে। কেপিএমজির প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়াঙ্ক সতর্ক করে বলেন, অর্থনীতিতে এখনও অনেক মূল্যচাপ রয়ে গেছে। তার ভাষায়, আমরা এমন এক মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি, যা উচ্চ, স্থায়ী ও আঠালো প্রকৃতির। বিভিন্ন খাতে মূল্যবৃদ্ধি আবারও ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের পুরো প্রভাব এখনো বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। এই সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তেল, ধাতু এবং সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সোয়াঙ্ক বলেন, খাদ্যের দামের ওপর যুদ্ধের পুরো প্রভাব এখনও আসেনি। সারের খরচ, ডিজেলের মূল্য, কম ফসল উৎপাদন এবং সম্ভাব্য এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাব শরৎকালীন ফসল তোলা এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। তার মতে, এর বাইরে গ্রীষ্মে নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে। এছাড়া উচ্চ তেলের দাম পরিবহন ও প্যাকেজিং খরচও বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, সামনে এখনও অনেক কিছু আসছে। ডায়ান সোয়াঙ্কের মতে, অনেক উদীয়মান অর্থনীতিতে রেশনিংয়ের কারণে কিছু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব রান্নার তেল ও পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহে পড়ছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় মূল্য ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এটি অন্তত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ বিদ্যুতের দাম এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যারের মূল্যও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই মূল্যবৃদ্ধি এমন সময় এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ টানা পাঁচ বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করছে। মূল্যস্ফীতির গতি এখন কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত মজুরি টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কমেছে। এপ্রিল মাসে যেখানে প্রকৃত মজুরি ০.৩ শতাংশ কমেছিল, মে মাসে সেই পতন বেড়ে ০.৭ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা আরও দুর্বল হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ভোক্তা ব্যয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডায়ান সোয়াঙ্ক বলেন, এটি ২০২২ সালের পরিস্থিতি নয়। কিন্তু সেটি হওয়ারও দরকার নেই। কারণ মূল্যস্ফীতি সময়ের সঙ্গে জমতে জমতে মানুষের নাগালের বাইরে দামকে নিয়ে যায়। আর এখন আবারও দাম বাড়তে শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ ভোক্তার জন্য পরিস্থিতি ভুল দিকে যাচ্ছে। এ কারণেই মানুষ ক্ষুব্ধ ও হতাশ।