ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানকে বিশেষ উপহার ডুমসডে পাঠাল রাশিয়া

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানকে বিশেষ উপহার ডুমসডে পাঠাল রাশিয়া

শান্তি ফিরছে না পশ্চিম এশিয়ায়। সপ্তাহ তিনেক আগে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে যে সমঝোতার এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে দুই মাসের যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়।

কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজের ওপর তার পরেও হামলা হয়েছে। তার জন্য দু’পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধবিরতি শেষ।

হরমুজের কাছে ভারতীয় নাবিকবাহী জাহাজে হামলার পর থেকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র হয়েছে। গত রোববার গভীর রাত থেকে ইরানে ফের হামলা শুরু করেছে আমেরিকা। একের পর এক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। হরমুজ থেকে দূরে অবস্থিত ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলিকেও নিশানা করা হচ্ছে। এর জবাবে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার বন্ধু দেশগুলিকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। হামলাও শুরু হয়েছে একাধিক দেশে। বাহরিনে বেজেছে সাইরেন। সেই আবহেই প্রকাশ্যে এল চাঞ্চল্যকর অন্য এক তথ্য। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরানে মোতায়েন করা হয়েছে রাশিয়ার ‘ডুমস্?ডে’ বিমান। ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া তার অন্যতম সুরক্ষিত অভিজাত আকাশ-ভিত্তিক কমান্ড বিমানটি তেহরানে পাঠিয়েছে। ‘ডুমস্?ডে’ বিমান বা টিইউ-২১৪পিইউ হল টুপোলেভ টিইউ-২১৪ যাত্রিবাহী বিমানের একটি বিশেষ সংস্করণ, যা ক্রেমলিনের জন্য একটি উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসাবে কাজ করে। ইরানি সামরিক ঘাঁটিগুলিতে মার্কিন হামলা জোরদার হতেই এই বিমানটি মোতায়েন করা হল, যা যথেষ্ট তাৎপূর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞেরা। টিইউ-২১৪পিইউ কোনো সাধারণ সরকারি বিমান নয়। সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল’ ব্যবস্থাযুক্ত বিমানটি আকাশের কমান্ড পোস্ট হিসাবে তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু টিইউ-২১৪পিইউ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব যাতে আকাশপথে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন, তা দেখাশোনা করে ‘রোসিয়া স্পেশ্যাল ফ্লাইট স্কোয়াড্রন’ নামের এক বিশেষ বাহিনী। টিইউ-২১৪পিইউ পরিচালনার দায়িত্বেও সেই বাহিনীরই রয়েছে। ‘রোসিয়া স্পেশ্যাল ফ্লাইট স্কোয়াড্রন’-এর অধীনে থাকা বিমানটি এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুরক্ষিত ডেটা লিঙ্ক এবং এমন সব প্রযুক্তিতে সজ্জিত, যা সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে রুশ কর্মকর্তাদের সরকারি এবং সামরিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনে সহায়তা করে।

‘ডুমসডে’-এর অর্থ পৃথিবীর শেষের দিন। কিন্তু বিশ্বনেতাদের কাছে এর অর্থ পরমাণু হামলা। যেমন, কোনো দেশ যদি রাশিয়ার উপর পরমাণু হামলা করে, তা হলে সেই ভয়ংকর দিনে টিইউ-২১৪পিইউ বিমানে আশ্রয় নিতে পারেন সে দেশের মাথারা। সেই বিমান থেকেই সরকারসহ সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবেন রুশ নেতারা। অর্থাৎ, পরমাণু হামলার পরিস্থিতি তৈরি হলে ‘ডুমসডে’ বিমানের কার্যকারিতা অনেক। সাধারণ ভিআইপি বিমানের সঙ্গে টিইউ-২১৪পিইউয়ের পার্থক্য অনেক। ‘ডুমস্?ডে’ বিমান এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও কার্যকর থাকতে পারে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

টিইউ-২১৪পিইউ বিমানে দু’টি ‘আভিয়াডভিগাটেল পিএস-৯০এ’ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন রয়েছে। ঘণ্টায় ৮৫০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে বিমানটি। সর্বোচ্চ পাল্লা ৬,৫০০ থেকে ৭,০০০ কিলোমিটার। তাই তেহরানে এর আগমনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বার্তা হিসাবে দেখা হচ্ছে। এটি এমন এক সময়ে মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের অংশীদারির ইঙ্গিত, যখন পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তি এবং উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে।

রাশিয়ার টিইউ-২১৪পিইউয়ের তেহরানে মোতায়েন নিয়ে ইতিমধ্যেই বিস্তর জল্পনা শুরু হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, দু’দেশের মধ্যে সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনার জন্য বিমানটিকে ইরানে মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ আবার মনে করছেন, আমেরিকা ও তার বন্ধুদেশগুলির কাছ থেকে বিপুল সামরিক চাপের মুখে থাকা ইরানের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে বিমানটি তেহরানে পাঠিয়েছে রাশিয়া। টিইউ-২১৪পিইউ বিমান টিইউ-২১৪ মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আবার সোভিয়েত আমলে নকশা করা মাঝারি পাল্লার যাত্রিবাহী বিমান টিইউ-২০৪-এর একটি উন্নত সংস্করণ। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট এবং সরু কাঠামোর বিমানটি ১৯৮৯ সালে প্রথম আকাশে ওড়ে এবং ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পুরনো টিইউ-১৫৪ বিমানের বিকল্প হিসাবে বাণিজ্যিক পরিষেবায় নিযুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিইউ-২১৪ সিরিজের বিমানগুলিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সাজিয়ে বিশেষ সংস্করণে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পণ্যবাহী বিমান, নজরদারি বিমান এবং সরকারি পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বিমান।

টিইউ-২১৪পিইউ হল টিইউ-২১৪ সিরিজের অন্যতম অত্যাধুনিক সংস্করণ, যাতে সুরক্ষিত যোগাযোগ এবং কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণমূলক অভিযানের জন্য ব্যাপক পরিবর্তন এবং প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। ফলে সরকার এবং সামরিক পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিমানটি অপ্রতিরোধ্য বলে মনে করা হয়। বিদেশি মহাকাশ এবং বিমান প্রযুক্তি-নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে রাশিয়া বার বার টিইউ-২১৪ এর উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেও শিল্প বিশ্লেষকরা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

২০২৮ সালের মধ্যে বছরে ২০টি পর্যন্ত বিমান উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা থাকা সত্ত্বেও এর উৎপাদন সীমিতই রয়ে গিয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মাত্র কয়েকটি বিমানই প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতের আবহের মধ্যেই রাশিয়ার এই বিশেষ বিমান মোতায়েন করা হল তেহরানে। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন পরিকাঠামো-সহ দেশটির সামরিক বাহিনীর বহু লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন জোর দিয়ে জানিয়েছে যে, হরমুজের উপর ইরানের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। যদিও তেহরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান বলছে, কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি হরমুজে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান।

এছাড়া, যেসব দেশে মার্কিন সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, সেসব দেশকে নিশানা করেও ইরান হামলা চালিয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত