প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
ইসলাম শুধু কতগুলো আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি মানবিক ও সামাজিক বিপ্লবের নাম। একজন মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদত ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না তার আচরণ ও চারিত্রিক মাধুর্য অন্য মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়। আধুনিক যুগে আমরা যখন ‘আদর্শ মানুষ’ বা ‘নিরাপদ সমাজ’ নিয়ে নানা তত্ত্ব দিচ্ছি, তখন থেকে চৌদ্দশ বছর আগে বিশ্বনবী (সা.) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু সারগর্ভ কিছু শব্দের মাধ্যমে মোমিন, মুসলিম, মুহাজির ও মুজাহিদের এমন এক সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা আজ পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে এবং মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তা ত্যাগ করে।’ (বোখারি : ১০)। ইমাম তিরমিজি ও নাসায়ি (রহ.)-এর বর্ণনায় আরও যুক্ত হয়েছে, ‘মোমিন ওই ব্যক্তি, যার কাছে মানুষের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ।’ আর ইমাম বাইহাকি (রহ.)-এর বর্ণনায় যুক্ত হয়েছে, ‘মুজাহিদ ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে নিজের নফস বা প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রাম করে।’
আচরণের নিরাপত্তায় যার পরিচয় : আমরা সাধারণত মনে করি, কালিমা পড়লে বা নামাজ-রোজা আদায় করলেই ইসলাম পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু নবীজি (সা.) আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকে। তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমানের প্রধান চিহ্ন হলো তার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকবে।’ যেমন-
মুখের নিরাপত্তা : একজন শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো তার ভাষা। বর্তমান সময়ে পরনিন্দা, চোগলখোরি, মিথ্যাচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটু কথা বলা এক মহামারির রূপ নিয়েছে। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, আপনার জিহ্বা যেন অন্যের সম্মানে আঘাত না হানে। আপনার একটি তীর্যক মন্তব্য বা একটি মিথ্যা স্ট্যাটাস যেন কোনো ভাইয়ের হৃদয় ভেঙে না দেয়।
হাতের নিরাপত্তা : হাতের নিরাপত্তা বলতে শুধু মারপিট বা শারীরিক আঘাত বোঝায় না; বরং কলমের খোঁচায় কারও ক্ষতি করা, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারও হক নষ্ট করা বা অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ গ্রাস করাও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃত ইসলাম তখনই প্রমাণিত হয়, যখন আপনার প্রতিবেশী, সহকর্মী এবং পরিবারের মানুষগুলো আপনার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার ক্ষতির আশঙ্কা করে না।
মোমিনের সংজ্ঞায় আমানত ও আস্থা : ঈমান শব্দের মূল অর্থই হলো ‘নিরাপত্তা দান করা’। ইমাম তিরমিজি বর্ণিত অংশে নবীজি (সা.) মোমিনের পরিচয় দিয়েছেন মানুষের রক্ত ও সম্পদের নিরাপত্তার মাধ্যমে। শিক্ষিত সমাজে লেনদেনের স্বচ্ছতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হাদিস অনুযায়ী, মোমিন তো সেই ব্যক্তি, যাকে দেখে মানুষ তার জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকবে। যখন ঈমান অন্তরে বদ্ধমূল হয়, তখন তা মানুষকে বাধ্য করে আমানত রক্ষা করতে। আপনি যদি ব্যবসায়ী হন, তবে আপনার কাস্টমার আপনার ওপর আস্থা রাখবে; আপনি যদি চাকরিজীবী হন, তবে আপনার প্রতিষ্ঠান আপনার সততার ওপর ভরসা করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে বলেছেন, ‘যার আমানতদারি নেই, তার ঈমান নেই।’ সুতরাং মানুষের আস্থা অর্জন করাই হলো ঈমানের পূর্ণতার পরিচায়ক।
পাপ ত্যাগের নিরন্তর যাত্রা : ‘হিজরত’ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক দেশ থেকে অন্য দেশে হিজরতের দৃশ্য। কিন্তু নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন ‘হিজরতে বাতেনি’ বা অভ্যন্তরীণ দিক। সেটি হলো, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করা। ?ইসলামের ইতিহাসে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে হিজরত হয়তো সব সময়ের জন্য ওয়াজিব নয়, কিন্তু গোনাহ থেকে হিজরত করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ‘ফরজে আইন’ বা বাধ্যতামূলক। একজন শিক্ষিত মুসলিম হিসেবে আমাদের আধুনিক জাহেলিয়াত, অশ্লীলতা, সুদ, ঘুষ এবং সামাজিক অনাচার থেকে প্রতিনিয়ত হিজরত করতে হবে। এ হিজরত কোনো স্থান পরিবর্তন নয়, বরং এটি হলো নোংরা অভ্যাস ত্যাগ করে পবিত্রতার দিকে ফিরে আসা। এটি এমন এক সফর, যা মৃত্যুর আগপর্যন্ত শেষ হয় না।
নিজের বিরুদ্ধে বিজয়ী বীর : বর্তমান পৃথিবীতে ‘জিহাদ’ শব্দটি নানাভাবে বিতর্কিত বা ভুল ব্যাখ্যায় পর্যবসিত। কিন্তু ইমাম বাইহাকি বর্ণিত হাদিসটি আমাদের জিহাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু চিনিয়ে দেয়। প্রকৃত মুজাহিদ সে-ই, যে আল্লাহর আনুগত্যের পথে নিজের নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। মানুষের নফস বা কুপ্রবৃত্তি সবসময় অলসতা পছন্দ করে, অন্যায়ের দিকে প্ররোচিত করে এবং বিপদে ধৈর্যহারা হয়। সকালে ফজরের সময় যখন ঘুমের মোহ আমাদের আচ্ছন্ন করে, তখন সেই মোহের বিরুদ্ধে লড়াই করে জায়নামাজে দাঁড়ানোই হলো জিহাদ। চোখের সামনে হারামের হাতছানি থাকলে তা উপেক্ষা করাও জিহাদ। এ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদই হলো ‘জিহাদে আকবর’ বা বড় জিহাদ। কারণ, যে ব্যক্তি নিজের ভেতরের শত্রুকে পরাজিত করতে পারে না, সে বাইরের দুনিয়ায় কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। এ জিহাদ কিছু সময়ের নয়। তা অবিরত ও আজীবন চলতেই থাকে। ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে দমনকারী আল্লাহর রাহে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে খুব সহজেই লড়াই করতে পারে। এ চারটি গুণ যখন একজন মানুষের মধ্যে একত্রিত হয়, তখন তার মধ্যে আর কোনো অপূর্ণতা থাকে না। তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের জন্য রহমত।
শিক্ষিত শ্রেণির জন্য শিক্ষা : আজকের শিক্ষিত মুসলিম সমাজকে চিন্তা করতে হবে, আমরা কি শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকব? আমাদের উচ্চশিক্ষা বা পদমর্যাদা যদি অন্যের জন্য ভীতির কারণ হয়, তবে আমরা নবীজি (সা.)-এর সংজ্ঞায় প্রকৃত মুসলিম হতে পারিনি। আমাদের কলম যেন কারও হকের বিরুদ্ধে না চলে, আমাদের মেধা যেন মানুষকে ঠকানোর কাজে ব্যবহৃত না হয়। ইসলাম আমাদের শুধু নিজের জান্নাত খোঁজার শিক্ষা দেয় না, বরং পৃথিবীকে জান্নাতের নমুনা বানানোর তাগিদ দেয়। আর সেই যাত্রা শুরু হয় নিজের হাত, মুখ এবং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।