প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ মার্চ, ২০২৬
মানুষের যত সওয়াব বা গোনাহ হয়, এর অন্যতম মাধ্যম কথা বা জবান। জবান বা কথার কারণেই মানুষ সওয়াব যেমন অর্জন করতে পারে, তেমনি গোনাহ কামাই করে। এ কারণে কথা বা জবানের বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বারবার তাগিদ এসেছে। রোজা পালনকালে কথা বা জবানের ব্যাপারে অধিকতর সতর্কতা কাম্য।
জবানের জন্য রয়েছে সদা প্রস্তুত প্রহরী : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে না কেন, তা লেখার জন্য তৎপর প্রহরী তার কাছে প্রস্তুত আছে।’ (সুরা কফ : ১৮)। অর্থাৎ মানুষ যখন যা বলে, চাই তা ভালো হোক বা মন্দ, তা লেখার জন্য সদা প্রস্তুত প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের অত্যধিক সতর্কতা কাম্য।
জান্নাতের নিশ্চয়তা : রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ জিহ্বা এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ গুপ্তাঙ্গ সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।’ (বোখারি : ৬৪৭৪)।
জ্ঞানীরা কম কথা বলেন : বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদগণ সর্বসম্মতভাবে এ কথা বলেছেন, ‘কথা বা শব্দের পদস্খলনই বিপদ বা ধ্বংসের কারণ। জ্ঞানী ও বিচক্ষণ মানুষ সবসময় কম কথা বলেন।
কথা মেপে মেপে বলেন। কারণ, অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি কথা বললে ভুল, মিথ্যা বা বিপজ্জনক কথা বের হওয়ার আশঙ্কা অধিক। ফলে ঈমানদার, প্রজ্ঞাবান ও সচেতন মানুষ কম কথা বলেন। তারা সর্বদা আল্লাহতায়ালার জিকিরে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখেন।’ এক সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলামের বিধান তো অনেক; আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা আমি গুরুত্বসহ পালন করব।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমার জবান যেন সদা আল্লাহর জিকির দ্বারা সতেজ থাকে।’ (তিরমিজি : ৩৩৭৫)।
ভালো কথার পুরস্কার ও খারাপ কথার শাস্তি : আল্লাহতায়ালার ভয়ে জ্ঞানীরা কথা বলার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। মিথ্যা, মন্দ, অশ্লীল ও অহেতুক কথা থেকে নিজেকে হেফাজত রাখার জন্য সবসময় অস্থির থাকেন। কারণ, তারা জানেন- প্রতিটি কথাই লিপিবদ্ধ হয়। সে অনুযায়ী ভালো কথার পুরস্কার ও খারাপ কথার শাস্তি দেওয়া হয়। এ জন্য তারা আল্লাহতায়ালার জিকির, ভালো কথার বাইরে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। বরং অধিকাংশ সময়ে নিশ্চুপ থেকে দ্বীন সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তি ভালো মুসলিম হওয়ার বৈশিষ্ট্য হলো, অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা।’ (তিরমিজি : ২৩১৭)।
জবানকে অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার না করা চাই : পক্ষান্তরে আরেকদল আছে, যারা নিজের কথা বা জিহ্বার লাগাম ছেড়ে দেয়। সবসময় অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় বা অশ্লীল কথা বলতে পরোয়া করে না। সুযোগ পেলেই গিবত-পরচর্চা, মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র করতে পিছপা হয় না। জবানকে তারা চক্রান্ত ও অপরের ক্ষতির কাজেই নিয়োজিত করতে সাময়িক তৃপ্তি পায়। এমন লোকের সংখ্যা সমাজে অনেক। অথচ হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
প্রকৃত মুসলমানের স্বরূপ : প্রতিদিন আমরা সবার সঙ্গে কমবেশি কথা বলি। কথা বলার মধ্যে অনেক সময় ভুল-ত্রুটি হয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, হাসি-তামাশায় কখনও কখনও অসত্য কথাও মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও নিষিদ্ধ। পবিত্র জিহ্বা দিয়ে যখন অপবিত্র মিথ্যা কথা বেরিয়ে আসে, তখন সমাজ ও সংসারে তৈরি হয় নতুন সমস্যা। জিহ্বার হেফাজত করার ব্যাপারে রাসুল (সা.) যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জবান ও হাত দ্বারা অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বোখারি : ৬৪৮৪)।
উত্তম কথা বলার তাগিদ : কথা বা জবানের ব্যাপারটি কত গুরুত্বপূর্ণ, তা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকেও জানা যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন কথা বলার সময় এমন সব কথা বলে, যা উত্তম। কেননা, শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রতি উৎসাহিত করে।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১২)।
জবানই বিশৃঙ্খলা ও শাস্তির কারণ : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘একজন আরেকজনের গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে। আর অবশ্যই তোমরা তা অত্যন্ত ঘৃণা করো।’ (সুরা হুজরাত : ১২)। অতএব, কথা বলার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল বা বিপজ্জনক কথা, যেমন- মিথ্যা, গিবত, কুটনামি ইত্যাদি কথার মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা অশেষ বিশৃঙ্খলা ও শাস্তির কারণ।
কথায় হোক সতর্কতা : কথার দ্বারা কমপক্ষে দশটি বিপদের বিষয়ে ইসলামি স্কলারগণ সতর্ক করেছেন। সেগুলো হলো- মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরি, বেহুদা বকবকানি, গালি-গালাজ, অশ্লীলতা, অভিসম্পাত, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উস্কানি, হিংসা-বিদ্বেষ প্রচার ইত্যাদি। যারা অসতর্ক হয়ে নিজের মনের খেয়ালে ও বেপরোয়া-লাগামহীনভাবে কথা বলে, তাদের দ্বারা এসব বিপদ ঘটার আশঙ্কা সর্বাধিক। এ কারণেই রাসুল (সা.) উম্মতকে সতর্ক করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (বোখারি : ৬০১৮)।
অহেতুক কথা সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ : কখনও এমন হয়, বলতে বলতে বেশি কথা বলাটাই কিছু মানুষের অভ্যাস হয়ে যায়। সাধারণ কাজের মতোও সে তখন মিথ্যা, গিবত ইত্যাদি বলতে থাকে। এগুলো যে চরম অপরাধ ও গোনাহের কাজ, তা অনুধাবন করার মতো ক্ষমতা বা মানসিক পরিস্থিতিও তার থাকে না। বেশি কথা বলার কুণ্ডঅভ্যাসের দাস হয়ে সে প্রতিদিনই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আজেবাজে ও অহেতুক কথা বলে সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ এবং গোনাহের ভাগীদার হতে থাকে। একবার রাসুল (সা.) তার প্রিয় সাহাবি ওকবা ইবনে আমের (রা.)-কে তিনটি অসিয়ত করলেন। এর প্রথমটি ছিল, ‘তুমি তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো।’ (তিরমিজি : ২৪০৬)।
জবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা : রাসুল (সা.) বিনয়কাতর হয়ে আল্লাহর কাছে জবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আমার কান, চোখ, জবান, হৃদয় ও লজ্জাস্থানের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই।’ (সুনানে আবি দাউদ : ১৫৫১)। সুতরাং আমাদেরও উচিত, জবানের সঠিক ব্যবহারের প্রতি সচেতন ও যত্নবান হওয়া এবং এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
রমজান ও কথা : রমজান মাসে কৃচ্ছ্বতার সময়ও কারও কারও মধ্যে কথাবার্তায় বেপরোয়া ভাব দেখা যায়। অকাতরে মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরি, বেহুদা বকবকানি, গালি-গালাজ, অশ্লীলতা, অভিসম্পাত, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উস্কানি, হিংসা-বিদ্বেষ প্রচার, কুৎসা, পরচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য মানুষের এবং নিজের বিপদ সৃষ্টি এবং আশপাশের পরিবেশ বিনষ্ট করতে অনেকেই তৎপর হয়। সারা বছরের বদঅভ্যাসের দাস হয়ে রমজানের পবিত্র পরিবেশকেও বিনষ্টে কেউ কেউ তৎপর হয়। অথচ তাদের রোজা কতটুকু কাজে আসবে, সে ব্যাপারে তারা মোটেও ভাবনা-চিন্তা করে না। এসব অপকর্মের মাধ্যমে রোজা নষ্টের পাশাপাশি অন্য রোজাদারকে কষ্ট দিয়ে অধিক গোনাহের ভাগীদার হয় সেসব দুর্ভাগা লোক। তাই রোজার সময় শারীরিক সংযমের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গ তথা জবানের নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত জরুরি। মাহে রমজানে জবান বা কথার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য্য।