ঢাকা শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আমরা মানুষ হব কবে, কী দোষ ছিল শিশু ইরার

ওসমান গনি
আমরা মানুষ হব কবে, কী দোষ ছিল শিশু ইরার

সভ্যতার অহংকারে আমরা প্রতিদিনই নিজেদের উন্নত বলে দাবি করি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, অবকাঠামোর বিস্তার, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, সবকিছুর হিসাব আমরা কষে দেখাই। কিন্তু সাত বছরের একটি শিশুর রক্তাক্ত দেহ যখন কোনো বনাঞ্চলের ভেতর থেকে উদ্ধার হয়, তখন প্রশ্ন জেগে ওঠে- আমরা সত্যিই মানুষ হয়েছি তো? নাকি শুধু উন্নয়নের আলোকচ্ছটায় নিজেদের অমানবিকতাকে আড়াল করে রেখেছি?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতর থেকে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ইরা নামের সাত বছরের এক শিশুকে। ঘটনাস্থল থেকে তার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। সে ছিল মসজিদ্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। নিষ্পাপ সেই শিশুটি কীভাবে, কার প্রলোভনে বা প্রতারণায়, নিজ এলাকা থেকে এত দূরের নির্জন স্থানে গেল- এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা থেকে যায়। জানা যায়, নিজ এলাকার এক ব্যক্তির সঙ্গে সে সেখানে গিয়েছিল এবং ওই ব্যক্তিকে দেখলে চিনতে পারবে বলেও ইশারায় জানিয়েছিল। কিন্তু সেই ইশারা পূর্ণ বাক্যে রূপ নেওয়ার আগেই তার কণ্ঠরোধ হয়ে যায়। গলা দিয়ে রক্ত ঝরছিল, কথা বলার শক্তি ছিল না। জঙ্গলের ভেতর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসা সেই দৃশ্য মানবতার বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।

সেখানে মন্দির সংস্কার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা তাকে দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইরার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। একটি সাত বছরের শিশুর জীবনের এত করুণ সমাপ্তি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা নতুন নয়। পত্রিকার পাতা উল্টালেই প্রতিনিয়ত এমন সংবাদ চোখে পড়ে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই আমাদের বিবেককে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একটি শিশু যখন নিরাপদ নয়, তখন কোনো সমাজই নিরাপদ হতে পারে না। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ- এই বহুল উচ্চারিত বাক্যটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাস্তব ব্যবস্থা না থাকলে এই কথার কোনো অর্থ থাকে না।

ইরার ঘটনায় কয়েকটি দিক বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রথমত, একটি সাত বছরের শিশু কীভাবে নিজের এলাকা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে চলে যায়? পরিবার, প্রতিবেশী, স্থানীয় সমাজ- কেউ কি টের পেল না? দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরিচিত কেউ হয়ে থাকে, তবে এই পরিচিত মুখের আড়ালেই কি লুকিয়ে ছিল হিংস্রতা? আমাদের সমাজে শিশুরা প্রায়ই ‘পরিচিত’ মানুষের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়। আত্মীয়, প্রতিবেশী, স্থানীয় প্রভাবশালী- বিশ্বাসের জায়গাটিই হয়ে ওঠে ভয়ংকর ফাঁদ। ফলে শুধু অপরিচিতকে সন্দেহ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং শিশুদের শেখাতে হবে ‘নিরাপদ স্পর্শ’ ও ‘অসুরক্ষিত স্পর্শ’ সম্পর্কে, সাহস জোগাতে হবে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা শেয়ার করার।

আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাদের কথা প্রায়ই হেসে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ইরা হয়তো কোনো ইঙ্গিত দিয়েছিল, হয়তো কোথাও অস্বস্তি প্রকাশ করেছিল- কিন্তু আমরা কি শুনেছি? পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। তারা যেন ভয় বা সংকোচ ছাড়াই যে কোনো ঘটনার কথা বলতে পারে। শিক্ষক-অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু পাঠদান বা ভরণপোষণ নয়; তাদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পর্যটনকেন্দ্র বা ইকোপার্কের মতো জায়গায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার উপস্থিতি থাকা উচিত। সিসিটিভি ক্যামেরা, টহল পুলিশ, প্রবেশ ও বহির্গমনের তথ্য সংরক্ষণ- এসব ব্যবস্থা থাকলে হয়তো অপরাধী দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতো। অপরাধ দমনে কঠোর আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তার দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস জোগায়। একটি ঘটনার পর যদি দীর্ঘসূত্রতায় বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে, তবে তা অন্য সম্ভাব্য অপরাধীকেও পরোক্ষ বার্তা দেয় যে, পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সংবেদনশীলতার সঙ্গে তথ্য উপস্থাপন করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী পরিবার দ্বিতীয়বার মানসিক আঘাত না পায়। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে শিশু সুরক্ষা ইস্যুকে সামনে আনতে হবে। সামাজিক সচেতনতা একদিনে তৈরি হয় না; নিয়মিত আলোচনা, প্রচার ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তা গড়ে তুলতে হয়।

ইরার মতো একটি শিশুর জীবন থেমে যাওয়ার পেছনে যে নির্মমতা কাজ করেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির বিকৃত মানসিকতার ফল নয়; বরং সমাজের নানা স্তরের অবহেলা ও ব্যর্থতারও প্রতিফলন। পরিবার যদি আরও সতর্ক হতো, সমাজ যদি আরও সজাগ থাকত, রাষ্ট্র যদি আরও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করত- হয়তো আজ ইরা বেঁচে থাকত। হয়তো সে স্কুলে যেত, খাতায় আঁকিবুঁকি করত, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখত।

আমরা প্রায়ই বলি, সন্তান আমাদের নয়নের মণি। কিন্তু বাস্তবে কি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা যথেষ্ট সময় দিচ্ছি? ব্যস্ততার অজুহাতে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, এসব বিষয়ে নজরদারি শিথিল হয়ে পড়ছে না তো? প্রযুক্তির যুগে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এসবের ব্যবহার যেমন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। যদিও ইরার ঘটনায় সরাসরি প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য নেই, তবুও সামগ্রিকভাবে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে আমাদের সব দিকেই সতর্ক থাকতে হবে।

একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার দুর্বলতম সদস্যের নিরাপত্তা দিয়ে। শিশু, নারী, প্রবীণ, যারা নিজেদের সুরক্ষা দিতে অক্ষম, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সভ্যতার পরীক্ষা। ইরার মৃত্যু সেই পরীক্ষায় আমাদের ব্যর্থতার নির্মম প্রমাণ। আমরা উন্নয়ন নিয়ে যতই গর্ব করি না কেন, যদি একটি শিশু ও নিরাপদ না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন। এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া জরুরি। অপরাধী যে-ই হোক, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শাস্তিই একমাত্র সমাধান নয়। প্রতিরোধই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পথ। স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, অভিভাবক প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন, এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। শিশুকে সম্পত্তি বা নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। তাদের অনুভূতি, ভয়, আনন্দ, সবকিছুকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে ও সমাজে সহমর্মিতার চর্চা বাড়াতে হবে। মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা বাস্তব আচরণে প্রতিফলিত হতে হবে।

ইরার নিথর দেহ আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, আমরা মানুষ হবো কবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো বক্তৃতায় নেই, কোনো স্লোগানে নেই। উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন আচরণে, সতর্কতায়, দায়িত্ববোধে। যদি আমরা সত্যিই মানুষ হতে চাই, তবে প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো ইরা যেন আর রক্তাক্ত গলায় জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে না হয়, কোনো মা-বাবাকে যেন সন্তানের নিথর দেহ বুকে নিয়ে আহাজারি করতে না হয়, এই অঙ্গীকারই হোক আমাদের মানবিকতার প্রথম ধাপ।

ইরার রক্তাক্ত বিদায় শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র জাতির হৃদয়ে অমোচনীয় ক্ষত তৈরি করেছে। এই ক্ষত তখনই অর্থবহ প্রতিবাদে রূপ নেবে, যখন আমরা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব নেব। পরিবার আরও সতর্ক হবে, সমাজ আরও সজাগ হবে, রাষ্ট্র আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, তবেই এই মৃত্যু বৃথা যাবে না। মানবিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার শর্ত। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন, অগ্রগতি, গর্ব, সবই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। তাই ইরার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানাতে হলে শুধু শোক নয়, প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আমরা মানুষ হবো- এই অঙ্গীকার যেন আর কাগজে না থাকে, বাস্তবের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত