ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফল উৎপাদনে নবম, প্রক্রিয়াজাতে তলানিতে

ফল উৎপাদনে নবম, প্রক্রিয়াজাতে তলানিতে

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৌসুমি ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নবম। আম, কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো ফল উৎপাদনে দেশের অবস্থান শীর্ষ সারিতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব বলছে, গত বছর (২০২৫) দেশে ১ কোটি ৫১ লাখ টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদনের এই জ্যামিতিক প্রবৃদ্ধি কাগজের পাতায় একটি সফলতার গল্প হলেও, শিল্প ও বাণিজ্য কাঠামোর বাস্তবতায় এটি মূলত একটি পচনশীল সাফল্য। কারণ, বিপুল পরিমাণ এই ফলের মাত্র ২ শতাংশের নিচে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আধুনিক সংরক্ষণাগার ও শক্তিশালী প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে প্রতি বছর উৎপাদিত ফলের ২০ থেকে ৪০ শতাংশই পচে নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস-এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ফল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের মোট উৎপাদনের গড়ে ৪৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে। উন্নত বিশ্বে এই হার আরও বেশি।

বৈশ্বিক প্রক্রিয়াজাত বাজারে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। দেশ দুটি ফল উৎপাদনের ৮০%-এর বেশি প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকা। উন্নত প্রযুক্তি ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের তাদের অবদান ৭০%-এর বেশি।

অন্যদিকে, বিশ্বের শীর্ষ ফল উৎপাদক দেশটি হচ্ছে চীন। তারা ৩০%-৩৫% ফল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। তবে দেশটি তাজা ফল রপ্তানিতে বেশি জোর দেয়। আর ভারত ৫% প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। প্রতিবেশি দেশটি বাংলাদেশের চেয়ে সামান্য এগিয়ে। তারা মূলত তাজা ফল রপ্তানিকারক দেশ।

অপরদিকে, ফল উৎপাদনে বিশ্বে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশের চিত্রটি বেশ করুণ। উৎপাদনের মাত্র ২% প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম দেশটি। সেই হিসেবে বলা যায়, বিপুল অপচয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ।

ফরচুন বিজনেসের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ বাজারের আকার দাঁড়াবে ১১.৭১ বিলিয়ন ডলারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে তা ২১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অথচ, এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব রীতিমতো অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খোঁজার মতো- মাত্র ০.০৩ শতাংশ। দেশে বর্তমানে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার প্রায় ৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারের। বড় শিল্পগ্রুপগুলোর (প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, আকিজ, বসুন্ধরা ইত্যাদি) তৈরি জুস, পাল্প বা ড্রাই ফুড বিশ্বের প্রায় ১৪৮টি দেশে রপ্তানি হলেও এর সিংহভাগই যাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বিশ্লেষণটি এক্ষেত্রে রূঢ় হলেও সত্যি। তিনি বলেন, ‘আমাদের পণ্যের মূল ক্রেতা এখনও প্রবাসী বাংলাদেশিরা, যাকে বলা হয় এথনিক মার্কেট। আমরা উন্নত বিশ্বের মূলধারার ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বহুমুখীকরণ করতে পারছি না। অর্থাৎ, বৈশ্বিক বাজারে আমরা আসলে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য বিক্রি করছি না, প্রবাসীদের কাছে ‘নস্টালজিয়া’ বিক্রি করছি।’

ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ার পেছনে শুধু উদ্যোক্তাদের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং সরকারি নীতি ও কাঠামোগত ব্যর্থতাই বেশি দায়ী।

ভুল জাতের ফল ও গবেষণায় দৈন্য : বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান স্পষ্ট জানান, প্রক্রিয়াকরণের জন্য যে ধরনের ফলের জাত প্রয়োজন, দেশে তার মারাত্মক অভাব রয়েছে। তাজা খাওয়ার ফল আর জুস বা পাল্প তৈরির ফলের জাত এক নয়, এই প্রাথমিক বোধটুকুও উৎপাদন পরিকল্পনায় অনুপস্থিত। এছাড়া কৃষি বাজেটের মাত্র ০.২৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকে গবেষণায়, যা বৈশ্বিক মানদণ্ড (ন্যূনতম ২%) থেকে যোজন যোজন দূরে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৌরাত্ম্য ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য : দেশে একটি খাদ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করতে প্রায় ৪২টি সংস্থার অনুমতি নিতে হয়। প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামালের মতে, মাত্রাতিরিক্ত নবায়ন ফি ও লাইসেন্স ফির কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তারা কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে পরামর্শ দেওয়ার বদলে জরিমানা করতেই বেশি উৎসাহী।

নিরাপদ খাদ্যের অভাব (গ্যাপ-এর অনুপস্থিতি): উৎপাদনে গুড অ্যাগ্রিকালচার প্র্যাকটিসেস (এঅচ) মানা হচ্ছে না। ফলে ফসলে মাত্রাতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও ভারী ধাতু মিশে থাকছে, যা প্রক্রিয়াকরণের সময় আলাদা করা যায় না। আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ল্যাবের অভাবে এই অনিরাপদ পণ্যগুলো বৈশ্বিক বাজারে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে।

প্রযুক্তির অভাব ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বৃত্তাবদ্ধতা : বিডা-এর তথ্যমতে, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকারী প্রতিষ্ঠানের ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক ড্রাইং ও প্যাকেজিং মেশিনের অভাবে তারা যুগ যুগ ধরে কেবল আচার, আমসত্ত্ব বা জ্যাম-জেলি উৎপাদনেই আটকে আছেন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এ পর্যন্ত ২৪ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে তা ল্যাবরেটরি থেকে মাঠে পৌঁছায়নি। কাঁঠাল বা কলার চিপসের মতো কিছু পণ্য জনপ্রিয় হলেও তা মুষ্টিমেয় উদ্যোক্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত