ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পাটের সুদিন ফেরাতে ৫ বছরের পরিকল্পনা

পাটের সুদিন ফেরাতে ৫ বছরের পরিকল্পনা

হারানো পাটকে ফেরাতে চায় সরকার; চেষ্টা চলছে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে বন্ধ পাটকল চালুর। বছর কয়েক ধরেই চলছে এমন চেষ্টা। আশা জাগাচ্ছে পাট পণ্য রপ্তানির আয়ের সাম্প্রতিক তথ্যও। বিদেশে পাটপণ্য বিক্রি বাড়তে থাকার গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বজায় থাকায় তা এ খাতের পুরোনো সম্ভাবনাকে আবারও উজ্জ্বল করেছে।

সবশেষ দুই মাসের রপ্তানি আয়ের তথ্য বলছে, বৈশ্বিক বাজারে পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্যের চাহিদার পাশাপাশি পাটের তৈরি শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, গার্ডেনিং বা বাগান, অটোমোবাইল ও প্যাকেজিংয়ে পাটপণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এছাড়া পাটকাঠির তৈরি চারকোলের চাহিদাও রয়েছে চীনসহ বিভিন্ন দেশে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ দুই মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ দুই মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ১১ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। সবশেষ দুই মাসে কাঁচাপাটের রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। পাটের সুতা রপ্তানি বেড়েছে ৫৮ শতাংশ। অন্যান্য পাটপণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৪৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে এসময়ে পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি থেকে আয় ১৩ শতাংশ কমেছে। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই প্রথম দুই মাসে বেড়েছে পাটপণ্য রপ্তানি আয়। গত অর্থবছরে মোট বেড়েছিল ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ; আয় এসেছিল ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ৮২ কোটি আট লাখ ডলার, যা ছিল এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছিল ৮২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। নতুন করে পাটের সম্ভাবনা জেগে ওঠার হাতছানির এমন দেখা প্রায়ই মেলে। তবে নানা কারণে সেটি আর আলোর মুখ দেখে না। ছয় বছর আগের তথ্য উপাত্তও তেমনটা ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২০-২১ আর্থিক বছরে ১১৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছিল; রপ্তানি তালিকায় চামড়াকে পেছনে ফেলে উঠে এসেছিল দ্বিতীয় স্থানে। আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছিল ৩১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। মোট রপ্তানিতে পাট খাতের অবদান ৩ শতাংশে উঠেছিল। সেই চাঙ্গাভাব আর থাকেনি। পরের টানা পাঁচ বছর কমে ২০২৪-২৫ আর্থবছরে ৮২ কোটি ডলারে নেমে আসে আয়; দ্বিতীয় স্থান হারিয়ে চতুর্থ স্থানে নামে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা বাড়ার পরও সেই চতুর্থ স্থানেই রয়েছে। সবার শীর্ষে যথারীতি তৈরি পোশাক। এর পর যথাক্রমে চামড়া, হোম টেক্সটাইল ও পাট। পাটপণ্য রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বন্যার কারণে গত বছর পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যায়। উচ্চ মূল্যের কারণেই অর্থের হিসাবে পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। তবে পরিমাণের দিক থেকে রপ্তানি বাড়েনি।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে পাট পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। সে বিবেচনায় শুধু দাম নয়, পরিমাণের দিক থেকেও রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে এ জন্য কাঁচা পাটের সরবরাহব্যবস্থা ঠিক রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন রপ্তানিকারকরা। একই সঙ্গে গবেষণা ও পণ্যের মান উন্নয়নের পাশাপাশি যৌথভাবে হলেও এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তারা।

বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। বছরে দেশে ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। পাটপণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এ খাতে রপ্তানি আয় পাঁচ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে বলা হয়।

নতুন সরকার পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনাও নিচ্ছে। এবার উচ্চাভিলাষি লক্ষ্য নয়; ২০৩১ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করতে চায় সরকার। পাশাপাশি পাটবীজে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং উচ্চমূল্যের পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এর মূল লক্ষ্য।

পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নূরুল বাসির বলেন, এ কথা ঠিক যে, পাটের সেই সুদিন ফিরিয়ে আনতে পারব না। তবে যে পথ হারিয়ে ফেলেছি, সেই পথ খুঁজে বের করে একটু ভালোভাবে হাঁটার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 'পাঁচ বছরের মধ্যে পাট খাত থেকে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার আয়ের লক্ষ্য আমাদের।' ইপিবির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাটের পাশাপাশি পাটের সুতা, বস্তা ও বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়। এসব পণ্য তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাটের সুতা রপ্তানি থেকে আয় ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়ে ৫৪ কোটি ৫৮ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও পরিমাণের দিক থেকে পাটের সুতার রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার টন পাটের সুতা রপ্তানি হয়। তার আগের অর্থবছর রপ্তানি হয়েছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাটের বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি ৫ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার হয়েছে। তবে কাঁচা পাটের রপ্তানি ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ১২ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে কাঁচা পাটের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে ৩৮ হাজার টন কাঁচা পাট রপ্তানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন। এছাড়া পাট দিয়ে তৈরি অন্যান্য পণ্য (বহুমুখী পাটপণ্য) ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৪৪ ডলারে নেমেছে। পাটকল উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, 'বছরের পর পর পাট নিয়ে আমরা আশাবাদের কথা শুনছি। কিন্তু কিছুই তো হচ্ছে না। স্বাধীনতার পর মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি বিদেশি মুদ্রা আসত যে খাত থেকে; সেই খাত পথ হারিয়ে ফেলল। আমরা সবাই চেয়ে চেয়ে দেখলাম; পরে রইলাম সবাই তৈরি পোশাক নিয়ে।'

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত