
দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী পাঁচদিন দেশের আবহাওয়ায় কুয়াশা ও শীতের প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এতে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং আগামী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কমার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, বর্তমানে উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের একটি বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। একই সঙ্গে মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার একটি বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। গতকাল সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া প্রথম দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, পঞ্চগড়, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা কিছু কিছু জায়গা থেকে প্রশমিত হতে পারে। এদিন সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এদিনও কুয়াশার কারণে যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
তৃতীয় দিন আগামীকাল রোববার থেকে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে এবং সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
চতুর্থ দিন আগামী সোমবার এবং পঞ্চম দিন আগামী মঙ্গলবার একই ধরনের আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ও সারা দেশে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। পঞ্চম দিনে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এ ছাড়া বর্ধিত পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে সারা দেশে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।
ঢাকায় নামতে না পেরে ৯ ফ্লাইট গেল চট্টগ্রাম-কলকাতাণ্ডব্যাংকক : ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতে পারেনি ৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এসব ফ্লাইট চলে গেছে চট্টগ্রাম, কলকাতা ও ব্যাংকক। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার ভোর পর্যন্ত কুয়াশায় রানওয়ে দৃশ্যমান না থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইটগুলোকে বিকল্প তিন বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ। তিনি জানান, কুয়াশার কারণে চারটি ফ্লাইট চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে, চারটি কলকাতা বিমানবন্দরে ও একটি ফ্লাইট ব্যাংকক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে সকাল ৯টার পর থেকে সব ফ্লাইট অপারেশন পুনরায় স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়। ডাইভারশন হওয়া ফ্লাইটগুলোকে ফিরিয়ে আনা শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শেরপুরে মৃদু শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন : শেরপুরে মৃদু শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গতকঅল শুক্রবার সকাল থেকেই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। এদিকে ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলাতেও সড়ক-মহাসড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। বেলা বাড়লেও সূর্যের দেখা না দেওয়ায় তীব্র শীত ও ঠান্ডা বাতাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রয়োজনের তাগিদে সকাল থেকেই কাজে বের হতে দেখা গেছে শ্রমজীবী মানুষ ও রিকশাচালকদের। দিনমজুরদের অনেকে কাজে যেতে না পেরে ইনকামও কমেছে তাদের। এর ফলে অনেক পরিবারের সদস্যদের খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। এদিকে তীব্র শীতে অভিজাত শপিং মলের পাশাপাশি ফুটপাতে গরম কাপড় বিক্রি বেড়েছে। তবে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
শেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. কহিনুর জাহান শ্যামলি জানান, এই তীব্র শীতে সবথেকে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু ও বয়োবৃদ্ধ মানুষ। প্রতিদিন ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ রোগী হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন।
শেরপুর জেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, আজ সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও বেড়েছে।
শীতে ঘন কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডায় মূলত বোরো ধানের বীজতলা, আলু, টমেটো, পেঁপে, সরিষা, ডাল ও বিভিন্ন শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে আলু ক্ষেতে লেট ব্লাইট বা পচন রোগ দেখা দেয়। এছাড়া তীব্র শীতে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, চারা হলুদ হওয়া এবং পরাগায়নে সমস্যা দেখা দেয়। যা ফলন কমিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কৃষকরা বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে অথবা খড় ও পাতা দিয়ে গোড়া ঢেকে রাখলে এবং প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করে এই ক্ষতি মোকাবিলা করা সম্ভব।
পঞ্চগড়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ : রাতভর কুয়াশা ঝরে বৃষ্টির মত। সকালের দিকেও কুয়াশাচ্ছাদিত থাকে পথঘাট। ঘন কুয়াশার সঙ্গে কনকনে শীতে কাবু পুরো জনপদ। দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রির নিচে। বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় জেলার তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে, বৃহস্পতিবার একই সময়ে তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিলো ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এদিন দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত কয়েকদির ধরে এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা একটু বেশি। দিনে সূর্যের দেখে মিললেও সন্ধ্যার পর আবারো শুরু হয় শীতের তীব্রতা।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, তাপমাত্রার পারদ ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে থাকলে সেটিকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। সে হিসেবে এখন এ অঞ্চলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জেষ্ঠ্য পর্যবেক্ষক জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, আজকে সকাল ৯টায় ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৪ শতাংশ। বাতাসের গতিবেগ ছিল ৮-১০ কিলোমিটার। জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত এমন শীত পরিস্থিতি থাকতে পারে।
৭ ঘণ্টা পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ফেরি চলাচল শুরু : প্রায় ৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তারা তথ্য জানিয়েছেন। বিআইডব্লিউটিসি পাটুরিয়া ঘাটের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আব্দুস সালাম জানান, শুক্রবার (গতকাল) ভোর ৩টায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার মধ্যে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ থাকার পর সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ফেরি পুনরায় চালু করা হয়।
বিআইডব্লিউটিসি পাটুরিয়া ঘাট সূত্র জানায়, যানজট নিরসনে সমস্ত ফেরি এখন পূর্ণ লোড নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলছে। এদিকে সোয়া ৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর যমুনা নদীতে আরিচা ও কাজিরহাটের মধ্যে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি আরিচাঘাটের ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ জানান, ঘন কুয়াশায় নদীর তলদেশ ঢেকে যাওয়ায় আজ শুক্রবার মধ্যরাত থেকে যমুনা নদীর আরিচা ও কাজিরহাটের মধ্যে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এ সময় আরিচা এবং কাজিরহাট উভয় স্থানেই সমস্ত ফেরি নোঙর করা হয়েছে। ঘন কুয়াশা কমার পর শুক্রবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে।