
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার দাফনের পঞ্চম দিনেও তার কবরে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর বিকেলে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। দাফনের পরদিন থেকেই প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।
গতকাল রোববার সরজমিনে সমাধি¯’ল ঘুরে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এবং দেশের দূর-দূরান্ত থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সারিবদ্ধভাবে আসছেন। শুধু দলীয় নেতাকর্মীই নন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ ফুল নিয়ে আসছেন। পুষ্পস্তবকে ঢেকে গেছে কবরের বেদি। সেখানে অনেককে দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা চোখ বন্ধ করে প্রার্থনায় মগ্ন থাকতে দেখা যায়। সমাধিস্থলের একপাশে আলেমদের কোরআন তেলাওয়াত করতেও দেখা গেছে। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ (কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটি) এবং শেরপুর জেলা ওলামা দলসহ বিভিন্ন সংগঠন মরহুমার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোনাজাত করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের অভিভাবকহীন করে চলে গেছেন। আমরা তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।’
বিএনপির আগামী নেতৃত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে কোনো হিংসাবিদ্বেষ ছিল না। কোনোদিন কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। ঠিক তেমনিও তারেক রহমানের মাঝেও কোনো ধরনের হিংসাবিদ্বেষ নেই। তিনি সবার সঙ্গে আলোচনায় বসছেন। সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার কথা ভাবছেন। আশা করি দেশনেত্রীর মতো সবাইকে একত্রিত করে দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করবেন।’
ব্যক্তিগত আবেগ থেকেও অনেকে ছুটে আসছেন সমাধি¯’লে। ৫৫ বছর বয়সী শাহাবুদ্দিনের নাতনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন কবর জিয়ারত করতে। তিনি বলেন, ‘নিজের মতো করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করেছি।’
আবার বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে আসা মনিরুজ্জামান হাওলাদার জানান, জানাজার দিন অসু¯’ হয়ে পড়ায় আসতে পারেননি। আজ একটু সু¯’ বোধ করায় আবেগ ধরে রাখতে না পেরে দেশনেত্রীর কবর জিয়ারত করতে ছুটে এসেছেন।
প্রধান বিচারপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ : নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় আপিল বিভাগের ১ নং এজলাস কক্ষে প্রধান বিচারপতিকে এই সংবর্ধনা দেয় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে বলেন, গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি অতি সম্প্রতি বিরল সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেওয়া বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি। তিনি এই জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, তিনি যেন এই মহীয়সী নারীকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা বক্তব্যে সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনও বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিগণ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকবৃন্দ উপ¯ি’ত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। গতকাল অবকাশ শেষে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রমের প্রথম দিনেই তাকে এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবরে ঢাবির সাদা দলের শ্রদ্ধা : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করে সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপিপšি’ শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তারা। সাদা দলের শিক্ষকরা সেখানে তাদের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করেন; দোয়া পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এবিএম সিদ্দিকুর রহমান নিজামী।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের অভিভাবকহীন করে চলে গেছেন। আমরা ওনার আত্নার মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ ওনাকে জান্নাত নসিব করুক।’
বিএনপির আগামী নেতৃত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে কোনো হিংসাবিদ্বেষ ছিল না। কোনোদিন কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। ঠিক তেমনি তারেক রহমানের মাঝেও কোনো ধরনের হিংসাবিদ্বেষ নেই। তিনি সবার সঙ্গে আলোচনায় বসছেন। সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার কথা ভাবছেন। আশা করি দেশনেত্রীর মতো সবাইকে একত্রিত করে দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করবেন।’
এসময় আরও উপ¯ি’ত ছিলেন- সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুস সালাম, মো. আবুল কালাম সরকার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান, সাদা দলের সদস্য সচিব অধ্যাপক মহিউদ্দিনসহ অন্যান্য শিক্ষকরা। প্রসঙ্গত, হাসপাতালে ৪০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে মারা যান দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। পরদিন জাতীয় সংসদের সামনে জনসমুদ্রের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাকে জিয়া উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সাতদিনের শোক পালন করছে বিএনপি। নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণের পাশাপাশি দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।