
সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি কতটা গভীর ও প্রভাবশালী, তা আমরা বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি। এই মাধ্যম যেমন ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার, তেমনি দায়িত্বহীন ব্যবহারে তা বহু গুণে নেতিবাচকতাও ছড়িয়ে দিতে পারে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই ব্যতীত শেয়ার করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।
এক ক্লিকেই শেয়ার করার সহজ সুযোগ তথ্যের গতি বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই তথ্যের স্বচ্ছতা ও সত্যতা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। আবেগপ্রবণ ও উসকানিমূলক শিরোনাম দেখে মানুষ যাচাই না করেই তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এসব তথ্যে কখনও ব্যক্তিকে হেয় করা হয়, কখনো সামাজিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা থাকে, আবার কখনও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। এতে করে সত্য যেন তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে ফেলছে।
আজকাল ভাইরাল হওয়া এক ধরনের অসুস্থ মানসিকতা। ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা কিংবা সামাজিক পরিণতির বিষয়টি খুব কম মানুষই বিবেচনায় নেয়। অথচ একটি মাত্র ভুল তথ্য কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তা অনেক সময় কল্পনারও বাইরে থাকে। গুজব বা ভুয়া সংবাদ সমাজে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যেখানে হাজারটি সঠিক তথ্যও একটি ভুল তথ্যের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে না।
সচেতন মানুষ হয়তো এসব বিভ্রান্তি সহজেই অনুধাবন করতে পারে, কিন্তু যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে দক্ষ নয়, তারা অনেক সময় সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কেও নেতিবাচক মন্তব্য সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে। এর প্রভাব পড়ে ধর্ম, রাজনীতি ও অন্যান্য সংবেদনশীল ইস্যুতে। পরবর্তীতে সঠিক তথ্য সামনে এলেও তা আর আগের মতো গুরুত্ব পায় না। ভুল ধারণা থেকে যায়, যার পরিণতিতে ব্যক্তিগত সম্মানহানি থেকে শুরু করে নানা জটিল সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতার পেছনে মূল ধারার গণমাধ্যমের দায়ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত ফ্যাক্ট চেকের অভাব এবং ‘কে আগে ব্রেকিং নিউজ দেবে’ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত রিচ ও ভিউ পাওয়ার লোভে অনেক সময় অসম্পূর্ণ বা যাচাইহীন তথ্যও প্রকাশ পায়, যা পরবর্তীতে গুজবের রূপ নেয়।
বাস্তবতা হলো, জনসাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, কিন্তু প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তাদের দক্ষতা সীমিত। ছবি বা ভিডিও যাচাইয়ের টুল, ডিজিটাল ফরেনসিক জ্ঞান কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য যাচাইয়ের প্রাথমিক কৌশল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তি আছে, কিন্তু দক্ষ ব্যবহারের অভাবে একই ধরনের ভুল বারবার ঘটছে। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবহারকারী যে ধরনের কনটেন্ট বেশি দেখে বা শেয়ার করে, অ্যালগরিদম তাকে সেই ধরনের কনটেন্টই বারবার দেখায়। ফলে ভিন্নমত ও ভিন্ন তথ্য চাপা পড়ে যায়। মিথ্যা তথ্য তখন বিশ্বাসযোগ্যতার মোড়কে মানুষের সামনে হাজির হয়।
দুঃখজনকভাবে কিছু মূলধারার গণমাধ্যমও কখনো কখনো স্রোতের বিপরীতে না দাঁড়িয়ে মানুষের আবেগকে পুঁজি করে। কখনো ভুল সংবাদ প্রকাশ, আবার কখনো সঠিক তথ্য উপস্থাপন; এই দ্বিচারিতা গুজব ছড়ানোর পথকে আরও প্রশস্ত করে দেয়। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এসব বিভ্রান্তি থেকে গণমাধ্যমও দায় এড়াতে পারে না। আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হলো, কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড বা গ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি করে। সাধারণ পাঠকের কাছে এগুলো দেখে মনে হয় যেন তথ্যটি কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও গভীর হয় এবং ভুল তথ্য দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে যায়। এই ধরনের ভুয়া কনটেন্ট শুধু জনমতকে বিভ্রান্ত করে না, বরং গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
এ ধরনের অপপ্রচার প্রতিরোধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। ডিজিটাল জালিয়াতির বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের মধ্যে ভয় ও সংযম তৈরি হবে। একই সঙ্গে এতে করে ভবিষ্যতে এমন বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ডের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাঠক ও ব্যবহারকারীর দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা, তথ্যটি কেন শেয়ার করা হচ্ছে, এই প্রশ্ন নিজেকে করা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ডিজিটাল নাগরিকত্বের চর্চা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সংবাদ প্রকাশের আগে ফ্যাক্ট চেক নিশ্চিত করা, সংবাদ মাধ্যমে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা এবং নীতিমালার প্রতি কঠোর থাকা প্রয়োজন।