
শীতের সকাল কিংবা সন্ধ্যায় ধোঁয়া ওঠা এক বাটি খিচুড়ির চেয়ে আরামদায়ক আর কী হতে পারে! খিচুড়ি শুধু একটি খাবার নয়- শীতকাল মানেই যেন আরাম করে নানা ধরনের সবজি ও উপকরণ দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি উপভোগ করা। এটি যেমন মন ভরায়, তেমনি পুষ্টিগুণে ভরপুর এ খাবার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
খিচুড়ি শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখে, শীতকালীন ক্লান্তি দূর করে এবং ঋতু পরিবর্তনের সময় হওয়া নানা অসুস্থতা থেকে সুরক্ষা দেয়। সবচেয়ে বড় কথা- এটি সহজপাচ্য এবং সব বয়সের মানুষের জন্য উপযোগী।
পুষ্টিবিদদের মতে, খিচুড়ির প্রতিটি উপাদানই শরীরের জন্য আলাদাভাবে উপকারী। খিচুড়িতে সবজি যোগ করলে আঁশের পরিমাণ বাড়ে। গোলমরিচ ও জিরার মতো মসলা বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করে। এছাড়া সাবুদানার খিচুড়ি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাতে কার্যকর।
চাল ও মুগ ডালের মিশেলে তৈরি এই খিচুড়ি যেমন সহজপাচ্য, তেমনি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এর বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে এর সরল মসলার ব্যবহারে। হলুদ, লবণ, জিরা বা ধনেগুঁড়ার মতো সাধারণ কিছু মসলা দিয়েই এটি রান্না করা হয়। রান্নার সময় মুগ ডালের সঙ্গে চাল হালকা ভেজে নিলে আলাদা সুগন্ধ পাওয়া যায়। কেউ চাইলে হলুদের পরিবর্তে সবুজ মুগডালও ব্যবহার করতে পারেন।
গাজর, মটরশুঁটি, ফুলকপি, আলু, টমেটোর মতো শীতের সবজি দিয়ে তৈরি সবজি খিচুড়ি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। শীতে পাওয়া প্রায় সব ধরনের শাক-সবজি এতে যোগ করা যায়। সবজিগুলো ছোট টুকরা করে কেটে নিতে হবে। যে সবজিগুলো সেদ্ধ হতে বেশি সময় নেয়, সেগুলো আগে ভেজে নেওয়া বা প্রেশার কুকারে দেওয়া ভালো। এরপর তেল বা ঘিতে জিরা, তেজপাতা ও অন্যান্য মসলা দিয়ে পেঁয়াজ, আদা ও রসুন ভেজে সবজিগুলো হালকাভাবে ভেজে নিন। ভেজে রাখা সবজি, চাল, ডাল ও প্রয়োজনীয় পানি দিয়ে প্রেশার কুকার বা হাঁড়িতে রান্না করুন। নরম খিচুড়ি চাইলে পানি একটু বেশি দিতে পারেন। রান্নার শেষ পর্যায়ে পালংসহ নরম শাক যোগ করুন।
ঠান্ডা পাহাড়ি অঞ্চলে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে তিল খিচুড়ি অত্যন্ত জনপ্রিয়। চাল, মাষকলাইয়ের ডাল ও তিল, এই তিনটি এর প্রধান উপকরণ। রান্নার আগে চাল ও ডাল ভিজিয়ে রাখা হয়। তিল হালকা ভেজে গুঁড়া করে নেওয়া হয়। তিল থেকে পাওয়া স্বাস্থ্যকর চর্বি ও খনিজ উপাদান শীতের দিনে শরীরের জন্য খুবই উপকারী। জিরা, হিং, হলুদ ও লাল মরিচ গুঁড়ার সুগন্ধি মিশ্রণ এতে অনন্য স্বাদ যোগ করে। খাঁটি ঘি অথবা তেল-মসলার ফোড়নে রান্না করা এই খিচুড়ি প্রোটিন, চর্বি ও মিনারেলে সমৃদ্ধ।
একই ধরনের খিচুড়ি খেতে একঘেয়েমি লাগলে বেছে নিতে পারেন আমলকি খিচুড়ি। এটি কোনো সাধারণ খাবার নয়। চাল, খোসা ছাড়ানো কালো মাষকলাইয়ের ডাল এবং তাজা আমলকি দিয়ে তৈরি এই খিচুড়ি নরম ও সুস্বাদু। স্বাদ ও সুগন্ধ বাড়াতে এতে জিরা, হিং, হলুদ ও লাল মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। সর্বশেষে ঘি বা তেলের সুগন্ধি ফোড়ন একে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। চাইলে পুষ্টিমান বাড়াতে বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক সবজি যোগ করা যেতে পারে। শক্তি জোগানোর পাশাপাশি হজমশক্তি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। শরীর ডিটক্সে সহায়তা করে, হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে, গ্যাস্ট্রিক কমায়, কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায় এবং ওজন কমাতে সহায়ক।
শীতের দিনে শরীর সুস্থ, মন চাঙ্গা আর রসনা তৃপ্ত রাখতে খিচুড়ির জুড়ি নেই। উপকরণ ও স্বাদের ভিন্নতায় প্রতিদিনই হতে পারে নতুন খিচুড়ির আয়োজন- যা একই সঙ্গে আরামদায়ক ও পুষ্টিকর।