
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে তীব্র শীতে ঠান্ডাজনিত রোগ বেড়েছে। জীবিকার টানে দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ খোলা আকাশের নিচে তীব্র শীতে কাজ করতে হয়। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা। তবে জীবিকার তাগিদে শীত উপেক্ষা করে কাজে বের হতে হচ্ছে তাদের।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে গত ২০ দিনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ৯ ও বয়স্ক নারী-পুরুষ সাত জন। চিকিৎসকরা বলছেন, রংপুরে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ।
হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্র জানায়, তিনটি ওয়ার্ডে ১২০ শয্যার বিপরীতে বুধবার পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি আছেন ৩৪ জন। হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রোগীতে ঠাসা মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ড। অনেক রোগীর চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে মেঝে ও বারান্দায়। রংপুরের হারাগাছ পৌরসভার কেয়া মনির (২০) দুই মাস বয়সী মেয়ে মুনতাহাও নিউমোনিয়া আক্রান্ত। কেয়ার মা নুরী বেগম বলেন, ‘সূর্য দেখা যায় না। রাইতোত ঝড়ির মতো টিনের চাল দিয়া শীত পড়ে। হামরা গরিব মানুষ। ল্যাপ (লেপ), তোশক নাই। বাচ্চা ছোয়া নিয়্যা চিন্তায় আছি।’
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘শীতে সব সময় ঠান্ডাজনিত রোগ বাড়ে। শীতকালে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, বিশেষত ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমার রোগী বেশি আসেন। এবারও চাপ আছে। এ ছাড়া শীতের সময় রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া হয়। কয়েক দিন আগে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি থাকলেও এখন কমেছে।’
নীলফামারীতে শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা : তীব্র শীতে শিশু থেকে বয়স্ক, সবাই পড়েছেন বেকায়দায়। গরম কাপড় মুড়ি দিয়ে চলাচল করছেন পথচারীরা। দিনের বেলায় হেড লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। ডিমলা আবহাওয়া অফিসের সহকারী কর্মকর্তা এমডি আব্দুস সবুর মিয়া জানান, এমন শীত আরও কয়েকদিন থাকতে পারে। ডিমলা খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের খগাখড়িবাড়ী গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল মজিদ জানান, ‘হামরা (আমরা) ভারতের হিমলায়ের কাছাকাছি থাকি। এজন্য এঠে প্রচুর ঠান্ডা হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের বমি, সর্দি, কাশি তো লাগি আছে। বিশেষ করে গরিব মানুষ কাহিল হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে শীতে দু’একখান কম্বল দেয়, তায় পায় হামার কপালত নাই।’
নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আব্দুল আউয়াল জানান, শিশু ও নবজাতক ওয়ার্ডে প্রত্যেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। ওসব রোগ থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও গরম পানি, গরম খাবার ও গরম কাপড় ব্যবহার করাতে বলা হচ্ছে। শিশুদের অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে শিশু বিষেশজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
সাতক্ষীরার আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, চলতি মৌসুমে বুধবার সকালে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পুরো জানুয়ারি মাসজুড়ে এই রকম আবহাওয়া থাকবে।
শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাজনিত রোগীও বাড়ছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক রিয়াদ হাসান বলেন, ‘তীব্র শীতে শিশুদের প্রতি বাড়তি সতর্কতা জরুরি। হাত-পায়ে মোজা পরানো, শরীর গরম কাপড়ে ঢেকে রাখা এবং বাসি খাবার এড়িয়ে চলার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের সতর্কতা বয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’
হিলিতে শীত ও ঘন কুয়াশায় মরে যাচ্ছে বীজ : হিলিতে গত কয়েকদিন ধরে চলা তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। অনেক বীজ গাজাচ্ছে না আবার কিছু গাজালেও হলুদ বর্ণের হয়ে পচে নষ্ট হয়ে মরে যাচ্ছে। বীজতলা রক্ষায় সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে দাবি কৃষি অফিসের। হিলির ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রচন্ড শীত আর ঘন কুয়াশায় বোরো বীজ ফেলেছি। কিন্তু গজাচ্ছে না। আবার অনেক বীজ গজালেও হলদে বর্ণের হয়ে মারা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে বীজের খুব সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন বীজের যে অবস্থা দেখা দিয়েছে তাতে করে কীভাবে বোরো আবাদ হবে, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ একই গ্রামের কৃষক আজগর আলী বলেন, ‘বোরো ধান রোপণের জন্য বীজ ফেলেছি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশায় বেশিরভাগ বীজ গাজাচ্ছে না। আবার যা গজাচ্ছে সেগুলো মরে যাচ্ছে।’
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, ‘চলতি বোরো মৌসুমে হাকিমপুর উপজেলায় ৩৯৬ হেক্টর বোরো বীজতলা রয়েছে। এর মধ্যে আদর্শ বীজতলা রয়েছে ২৯৮ হেক্টর। সেক্ষেত্রে যেসব আদর্শ বীজতলা রয়েছে সেখানে নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু চলছে। আমরা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। যাতে তীব্র শীতে বোরো বীজতলা রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ছত্রাকনাশক স্প্রে করার কথা বলছি। যখন ঘন কুয়াশা থাকছে সূর্যের আলোর দেখা মিলছে না সেসময় বীজতলাগুলোর বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে বোরো বীজতলাগুলো স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিন থেকে চার দিন সূর্যের আলো দেখা না দিলে সেসময় একটু রশিটানা দেওয়া হয়। রাতের বেলা বীজতলাকে কিছু সময়ের জন্য শিশিরটাকে ছোয়ানো যায় সেটি বীজতলার জন্য খুব উপকারী। এসব পদ্ধতি অবলম্বন করলে বীজতলার ক্ষতি হবে না।’