
স্বাধীন সাংবাদিকতা দেশের কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে বরং সরকারের লাভ হবে, কারণ স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান একমাত্র সরকারকে সত্য বলতে পারে। কেউ কারও বিরোধী নয়, সবাই সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পক্ষে। তাই সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথ মুক্ত রাখা জরুরি। সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের অভাব আছে। মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়- তাহলে সংবাদপত্রের ভূমিকা, সাংবাদিকের উন্নয়ন এবং সংবাদপত্রের উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশক, সম্পাদক এবং সাংবাদিকরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬-এ তাদের ভাবনা তুলে ধরেন। গণমাধ্যম সম্মিলনে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিকরা। এতে সঞ্চালনা করেন- সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন- সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএইজ-র সম্পাদক নুরুল কবীর। তিনি বলেন, ‘সমাজে ভিন্নমত থাকবে, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে, ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষ কথা বলবে- এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটা মনে রেখে আমরা সবাই এখানে সম্মিলিত হয়েছি। আমরা আশা করি, আপনাদের যা যা চিন্তা-ভাবনা সেগুলো একসঙ্গে করে সম্মিলিতভাবে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
নুরুল কবীর বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে একদিকে যেমন সংঘবদ্ধতার প্রয়োজন, সম্মিলিত প্রয়াসগুলো গ্রহণ করার প্রয়োজন। সব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে, তেমনই গোটা সমাজের মধ্যে আমাদের এই চিন্তার সঞ্চার করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবেই সহযোগিতা করতে হবে।’ ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘স্বাধীন সাংবাদিকতাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা সরকারকে সত্য কথা বলতে পারে। একটা সরকার সত্যিকার অর্থে যদি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে, সেই উদারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।’
সরকারের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকরা বলবে না ভয়ে এবং সরকারের ব্যুরোক্রেসি বলবে না, আপনার সরকারের ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি বলবে না। তারা সবসময় আপনাকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হলো একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা আপনাকে সত্য কথা বলবে।’ দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘এই যে ঐক্য থাকা, ঐক্যবদ্ধ থাকা, একত্রিত হওয়া, একে অন্যের পাশে থাকা এবং তাদের প্রতি সম্মতি-সহানুভূতি জানানো, এটা খুবই খুবই জরুরি। এটা আমাদের ভাবার কোনো কারণ নাই যে আগামী নির্বাচিত সরকার আসলেই আমাদের সবকিছু আমরা পেয়ে যাব। অতীতে হয়নি, এখনও হবে না। আগামীতে এদের ভাবনাটাও আমাদের জন্য সাবধানের সঙ্গে, সতর্কতার সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে। আর আবারও বলি, ঐক্য-সমঝোতা এবং সংহতি এই সময়ে আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, এটা আমাদের মানতে হবে।’
যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘আপনাদের যখন দালাল বলা হয়, আমার দুঃখ লাগে এবং বলবেই না কেন! যারা ছিল কয়দিন আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে তারা সবাই হয়ে গেল এখন বিএনপির পক্ষে, এটা একটা অদ্ভুত নাকি এটা ম্যাজিক। এই ম্যাজিক কেনও আপনার পাল্লায় পড়েছেন, এই ম্যাজিক আপনি করবেন না। সুতরাং এটা আপনার সম্মান বাড়ছে না বরং কমছে।’ তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সাংবাদিকতা এখনও বাংলাদেশে সম্মানজনক পেশা হয়ে ওঠেনি। সাংবাদিকরা বর্তমানে যে অবস্থানে আছেন, তা সম্মানজনক নয়। অথচ তাদের সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।’ শফিক রেহমান আরও বলেন, ‘সাংবাদিকদের প্রতি আমার একটি পরামর্শ, আপনারা একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখুন।’
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমি শুধু এইটুকুই আশা করি, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তরণে আমরা যাব, যারা এই জনগণের ম্যান্ডেট পাবে, তারা যেন আমাদের এই কথাগুলো শুনে, আজকের এই কথাগুলো এখান থেকে কিছুটা যদি মেসেজ উনারা নেন, তাহলে হয়তোবা আগামী দিনে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য তারা একটা পরিবেশ তৈরি করতে আমাদের সাহায্য করবেন।’
রংপুরের দৈনিক যুগের আলোর সম্পাদক এবং প্রকাশক মমতাজ শিরীন বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমরা যেটা মনে করি, গণমাধ্যমকে রক্ষা করতে গেলে সর্বপ্রথম যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো একে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। রাজনীতির বাইরে রেখে তবেই হয়তো গণমাধ্যমকে আলাদা করা যাবে এবং আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারব।’
নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহ-সভাপতি মুনিমা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের হাউজগুলোর মধ্যেই বিভিন্ন সমস্যা। সেই হাউসগুলোকে যদি আমরা একটু ছোট ছোট করে যদি আমরা তৈরি করতে পারি, আমাদের পেশাদারত্ব যে জায়গাটা, সহানুভূতি সমমর্মিতা এই শব্দগুলো আসলে আমাদের পেশাদারীর মধ্যে নাই। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থেকে আমরা আসলে বের হয়ে আসার জায়গাটা আমাদের তৈরি হওয়ার দরকার। পেশাদারত্ব জায়গাগুলোকে আমাদের তৈরি করতে হবে, আমাদের নারীর রিপ্রেজেন্টেশন দরকার, এটা যদি হয় সেখানে জাতি-বর্ণ সবার রিপ্রেজেন্টেশন দরকার। তো তাদের ভয়েস যদি থাকতে হয়, আমরা বলি সমাজকে পরিবর্তন করব। কিন্তু সমাজে পরিবর্তনের জন্য আমাদের তাদের ভয়েসটাও আমাদের ভাবতে হবে।
চট্টগ্রামভিত্তিক দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এমএ মালেক বলেছেন, ‘প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে তথ্যের শূন্যস্থান তৈরি হয়। আর এই শূন্যস্থান দখল করে নেয় ফেক নিউজ বা ভুয়া সংবাদ, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। এই পরিস্থিতি কখনও মঙ্গল বয়ে আনে না, কখনও আনেনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা আজ এখানে সমবেত হয়েছি, আমরা কারও বিরুদ্ধে নই। আমরা শুধু সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথটা মুক্ত রাখার আহ্বান জানাতে এসেছি। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম যে ভয়হীন পরিবেশে, কোনো বাধা ছাড়াই চলতে পারে, সে আবেদন নিয়ে এসেছি। সেই দাবি জানাতে এসেছি।’
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ বলেন, ‘সাংবাদিকদের মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় না বা তারা পায় না। এই যে সাংবাদিকদের মানে মূল্যায়নের যে প্রশ্নটা সে অবমূল্যায়নের প্রশ্নটা কেন? অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের ওই যে সাংবাদিকতার মানটা বজায় রাখার প্রশ্নে আপোষ হচ্ছে বা মানটা রক্ষা করা যাচ্ছে না। এটা রক্ষা করতে না পারার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। সেই কারণগুলো আমাদের দূর করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য আমরা একটা সাংবাদিকতা সুরক্ষা আইনের সুপারিশ করেছিলাম সংস্কার কমিশন থেকে এবং এই সুরক্ষা আইনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন সবাই। সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে দুজন উপদেষ্টা ছিলেন তারা অঙ্গীকার করেছিলেন, ওই আইনটা হবে। কিন্তু সে আইনটা হয়নি এবং আমি আবারও একই কথার পুনরাবৃত্তি করব যে আমরা সুপারিশ জমা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যতজন সাংবাদিক গণমাধ্যমকর্মী দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত হয়েছেন, যেসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আক্রমণের শিকার হয়েছে, এর দায় দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে, কারণ তারা অঙ্গীকার করেও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি।’
গাজীপুরের শ্রীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এসএম মাহফুল হাসান হান্নান বলেন, ‘সত্যিই ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। অধিকার কেউ কাউকে বিলিয়ে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। আমাদের অধিকার আমাদেরই আদায় করে নিতে হবে। আমি আজকে অনুরোধ করব সম্পাদক পরিষদকে একটা আইন করার জন্য, এটা যদি আমাদের আইন আমরা নিজেরা করে নেই, তাহলে আসলে দুর্বৃত্ত সাংবাদিক থাকবে না এবং আমাদের ঐক্যও ঠিক থাকবে।’
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান বলেন, ‘এখানে আমাদের প্রাথমিক পর্যায়ে যে কথাগুলো উঠে আসছে, সব বিজ্ঞ সাংবাদিক, বিজ্ঞ নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আমাদের ঐক্য প্রয়োজন। মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে আমাদের যে উপলব্ধি হয়েছে, আমি মনে করি ঐক্য দরকার। কিন্তু ঐক্যের কথা বলেও আসলে কী আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারব? প্রশ্ন থেকে যায়, কারণ আমরা যদি অন্তরকে পরিষ্কার না করি, আমরা যদি সদলীয় সংকীর্ণতা থেকে দূরে সরে আসতে না পারি তাহলে কোনোভাবেই আমাদের ঐক্য সফলতার মুখ দেখবে না।’