ঢাকা রোববার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইরানকে ধন্যবাদ জানালেন ট্রাম্প

* বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে * সরকার পতনে বিপ্লবী গার্ডের ওপর হামলার আহ্বান রেজা পাহলভির
ইরানকে ধন্যবাদ জানালেন ট্রাম্প

ইরানের সরকার রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় দেশটির প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউজ ছাড়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই বিরল প্রতিক্রিয়া জানান। ফ্লোরিডার পাম বিচে নিজের মার-এ-লাগো রিসোর্টে সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে যাওয়ার সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরান ৮০০-এর বেশি মানুষের ফাঁসি বাতিল করেছে।’ ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘তাদের এই সিদ্ধান্তকে আমি অত্যন্ত সম্মান জানাই।’

রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও ইরানের এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি জানান, ইরানে ৮০০-র বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল, যা এখন আর হচ্ছে না। পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ধন্যবাদ!’ ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলাকালে দেশটির সরকার যদি গণহারে মানুষ হত্যা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক হামলা চালাতে পারে, ট্রাম্পের এমন হুঁশিয়ারির কয়েক দিন পরই তার এই ইতিবাচক মন্তব্য সামনে এলো। যদিও বর্তমানে ইরানে সেই বিক্ষোভের রেশ অনেকটা কমে এসেছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে এটিই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ইরান মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা আপাতত কমে আসছে।

ইরানের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির সঙ্গে প্রেসিডেন্টের এই ইতিবাচক মূল্যায়নের তেমন সামঞ্জস্য দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও, তার এই বক্তব্য এটিই প্রমাণ করে যে, দেশটিতে মার্কিন হামলা আসন্ন বলে তিনি আগে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা থেকে তিনি এখন সরে আসছেন।

এর আগে ইরানি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ তবে গত শুক্রবার যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে সেই প্রতিশ্রুতি এখনও বহাল আছে কি না, তখন তিনি উত্তর দেন, ‘দেখা যাক কী হয়।’ আরব এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের চাপে কি তিনি ইরান হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন, সাংবাদিকদের এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ আমাকে বোঝায়নি। আমি নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের ফাঁসি কার্যকর করার কথা ছিল। তারা কাউকে ফাঁসি দেয়নি। তারা এই মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে এবং বিষয়টি (আমার ওপর) বড় প্রভাব ফেলেছে।’ তবে ইরান সরকারের কার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি এই ফাঁসি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন, সে ব্যাপারে ট্রাম্প পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, একদিকে ট্রাম্প যখন ইরানের প্রশংসা করছেন, অন্যদিকে কঠোর দমনের মাধ্যমে দেশটিতে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে বিক্ষোভ স্তিমিত করার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর নড়বড়ে অর্থনীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরবর্তীতে দেশটির ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি আন্দোলনে রূপ নেয়। তবে বর্তমানে সেই অস্থিরতা থেমে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী তেহরানে কোনো বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি; সেখানে কেনাকাটা ও জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যদিও সপ্তাহব্যাপী চলা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি এখনও অব্যাহত রয়েছে।

দেশটির অন্যান্য স্থানেও নতুন করে কোনো সহিংসতার খবর জানায়নি কর্তৃপক্ষ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’ গত শুক্রবার জানিয়েছে, বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৭৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এই সংখ্যা এখনও বাড়ছে।

এদিকে, ইরানের নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেওয়া হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন। পাহলভি আশা প্রকাশ করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবেন না।

এইচআরএএনএর পরিসংখ্যান- ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে : ইরানে চলমান সরকারবিবোধী বিক্ষোভে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএর বরাত দিয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত আট দিন ধরে টানা বন্ধ থাকার পর দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারে একেবারে সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। ধীরে ধীরে জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নতুন করে দেশটির কোনো প্রান্তেই বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। এইচআরএএনএ বলেছে, ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভণ্ডসহিংসতায় ৩ হাজার ৯০ জনের প্রাণহানির তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৮৫ জন বিক্ষোভকারী।

দেশটির নাগরিকরা বলেছেন, কঠোর দমন-পীড়নের কারণে বিক্ষোভ বর্তমানে অনেকাংশে স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আরও অনেক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারের খবর দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকজন বাসিন্দা বলেছেন, রাজধানী তেহরান টানা চার দিন ধরে তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, শহরের আকাশে ড্রোন উড়তে দেখা গেছে। তবে গত বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার বড় ধরনের বিক্ষোভের লক্ষণ দেখা যায়নি। ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী উত্তরাঞ্চলীয় একটি শহরের একজন বাসিন্দা বলেছেন, সেখানকার রাস্তাঘাটও শান্ত রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় এবং পরে তা ইসলামি প্রজাতন্ত্রে ধর্মীয় শাসনের অবসান দাবিতে ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয়। গত সপ্তাহের শেষ দিকে ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও এক ইরানি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছে, ??প্রায় ২০০ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গতকাল সকালে ইরানে ইন্টারনেটের সংযোগে হালকা উন্নতি দেখা গেছে। তবে সংযোগের মাত্রা স্বাভাবিকের প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।

বিদেশে বসবাসরত কয়েকজন ইরানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, গতকাল শনিবার ভোরের দিকে ইরানে থাকা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করতে পেরেছেন তারা। বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে এর আগে একাধিকবার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরানের নেতারা গণহারে ফাঁসি কার্যকর করার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রুথ স্যোশালে দেওয়া পোস্টে মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা জানাই যে, গতকাল (৮০০ জনেরও বেশি) নির্ধারিত সব ফাঁসি ইরানের নেতৃত্ব বাতিল করেছে। ধন্যবাদ!’ তবে ইরান এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি কিংবা সেগুলো বাতিল করা হয়েছে বলেও জানায়নি।

ইরান থেকে ফেরা ভারতীয় শিক্ষার্থী ও তীর্থযাত্রীরা বলেছেন, দেশটিতে অবস্থানকালে তারা নিজ নিজ আবাসস্থলে আটকা ছিলেন। সেই সময় ভারতে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তারা।

তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী জেড সাইদা বলেন, আমরা শুধু সহিংস বিক্ষোভের গল্পই শুনেছি। একবার এক ব্যক্তি জ্বলন্ত লাঠি হাতে আমাদের গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্থানীয় ভাষায় কিছু একটা চিৎকার করছিল, তার চোখেমুখে ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু রয়েছে এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে নয়াদিল্লি।

ইরানে সরকার পতনে বিপ্লবী গার্ডের ওপর হামলার আহ্বান রেজা পাহলভির : ইরানের শেষ শাহ-র (রাজা) ছেলে রেজা পাহলভি ইরানের সরকার পতনে বিশ্বকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন পুরো বিশ্ব যেন বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করে। এর অংশ হিসেবে বিপ্লবী গার্ডের ওপর হামলা চালাতে বলেছেন তিনি। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে রেজা বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবেই। এটি হবে নাকি হবে না, প্রশ্ন সেটি নয়। পতন কখন হবে প্রশ্ন হলো সেটি।’ তিনি বিপ্লবী গার্ডের ওপর সার্জিক্যাল হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রেজা বলেছেন, ‘বিপ্লবী গার্ডের ওপর হামলা চালালে আমাদের কাজ আরও সহজতর হবে এবং আরও প্রাণহানি আটকানো যাবে।’ গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর এক সপ্তাহের ব্যবধানে এটি সহিংস রূপ ধারণ করে। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার রেজা পেহলভির কথায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নামেন। কিন্তু ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী এটি শক্তহাতে দমন করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী ওই আন্দোলনে ২ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। ইরান সরকার জানিয়েছে শত্রুদের প্ররোচণায় দাঙ্গাবাজরা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে আছে। ফলে ঠিক কতো মানুষ হতাহত হয়েছেন সেটি এখনও স্পষ্ট নয়।

রেজা পাহলভি আজকের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি ইরানে ফিরবেন এবং দেশটির সংবিধান পরিবর্তন করবেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালাতে চায়নি। তাই সরকার অন্য দেশ থেকে মিলিশিয়াদের এনে বিক্ষোভ দমন করেছে। ইরানে পরবর্তীতে কে নেতা হবেন এমন প্রশ্ন করা হলে রেজা পাহলভি বলেন, ‘এটি ইরানের মানুষ ঠিক করবে। আমি শুধু তাদের স্বাধীন হতে সহায়তা করছি।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত