
কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর শক্ত প্রতিপক্ষ জুলাই আন্দোলনে আলোচিত ছাত্রনেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। ভোটের মাঠে লড়াইয়ের আগেই এই দুই প্রার্থী এখন আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় এবং উচ্চ আদালতে গিয়েও তা ফিরে না পাওয়ায় এখন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে গেছে তার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি। গত বুধবার দুপুরের পর প্রার্থিতা ফিরে পেতে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর করা রিট খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এতে ঋণখেলাপি থাকায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ঝুলে যাওয়ায় আপাতত হাসনাতের সামনে মাঠে আর কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী রইলো না। যদিও মুন্সীর আইনজীবীরা বলছেন, ‘মুন্সীর প্রার্থিতা ফিরে পেতে তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই আসনে টানা ৪ বারের অপরাজিত এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। নির্বাচনি ভোটের মাঠে ৭৭ বছর বয়স্ক মুন্সীর সঙ্গে শক্ত প্রতিপক্ষ ২৭ বছরের জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আবদুল্লাহ। কিন্তু ঋণখেলাপি আর হলফনামার তথ্য গোপন করার অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় ধানের শীষের এই প্রার্থী মুন্সীর ভাগ্যে কী আছে? এই আসনটি কি এবার বিএনপি প্রার্থী শূন্যই থাকছে? এমন প্রশ্নই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। গত বুধবার সকাল থেকে জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে প্রার্থীদের যখন প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন মঞ্জু মুন্সী ও হাসনাত ছিলেন উচ্চ আদালতে। হাসনাতের পক্ষে তার নেতাকর্মীরা দলের প্রতীক গ্রহণ করেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতন মহলের অভিমত, এই আসনে মঞ্জু মুন্সী শেষ আইনি লড়াইয়ে প্রার্থিতা ফিরে না পেলে ভোটের মাঠে জামায়াত জোটের প্রার্থী হাসনাতের সামনে শক্ত আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকছে না। ভোটাররা বলছেন, মুন্সী ভোটে না থাকলে অনেকটা বিনাবাধায় জয়ী হতে যাচ্ছেন হাসনাত। তবে আইনি লড়াইয়ে মঞ্জু মুন্সী মাঠে ফিরলে উভয়ের মধ্যে তুমুল ভোটযুদ্ধ হবে। তবে মুন্সী ভোটে না থাকলেও হাসনাতের সঙ্গে মাঠে থাকছেন ৪ প্রার্থী। তারা হলেন : ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ইরফানুল হক সরকার (আপেল), খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (দেয়াল ঘড়ি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবদুল করিম (হাতপাখা) ও গণঅধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন (ট্রাক)।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেছিলেন এই আসনের এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি আপিলে অভিযোগ করেন, বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। পরবর্তীতে গত ১৭ জানুয়ারি আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে এ বিষয়ে শুনানি শেষে হাসনাত আবদুল্লাহর আপিল মঞ্জুর করে ইসি। শুনানিতে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষিত হয়। এতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া সিদ্ধান্তের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। তবে এই শুনানিতে ঋণখেলাপির কারণে মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে না পাওয়ায় মুন্সীর ভাগ্য এখন ঝুলে গেছে। এতে মুন্সী অনুসারীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিলেও জামায়াত জোটের প্রার্থী হাসনাত ও তার অনুসারীদের দেখা গেছে ফুরফুরে মেজাজে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও অনুসারীদের ফেসবুকে মঞ্জু মুন্সীর মনোনয়ন ফিরে না পাওয়ার খবরটি অধিক হারে পোস্ট করতে দেখা গেছে।
গত বুধবার বিকালে হাইকোর্টের রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে হাসনাত আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিয়ালকে মুরগি পাহারায় রাখলে যেমন মুরগি রক্ষা হবে না, তেমনি ঋণখেলাপি আর ব্যাংক লুটকারীদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠালে ব্যাংক চোরদের ধরা যাবে না।’ হাসনাত আরও বলেন, ‘আমাদের যুদ্ধ ঋণখেলাপি আর লুটেরাদের বিরুদ্ধে। মঞ্জু মুন্সী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। হলফনামাতেও তিনি তথ্য গোপন করেছেন। তাই আদালত ঋণখেলাপি হিসেবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। তার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। আদালত তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও মঞ্জু মুন্সী কল রিসিভ করেননি। তবে মুন্সীর ব্যক্তিগত আইনজীবী মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ মামুন বলেন, ‘এখনও মনোনয়ন ফিরে পাওয়া না পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া কিছু বাকি আছে। সব চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আমরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছি। আগামী সোমবার শুনানিতে আশা করি উচ্চ আদালত থেকে মুন্সী মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে পাবেন।’